বুধবার ২৭শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১১ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী সুস্বাদু পানীয় খেজুরের রস ও গুড়

সামসুল হক জুয়েল, গাজীপুর প্রতিনিধি :  |  আপডেট ৭:০৯ অপরাহ্ণ | সোমবার, ০৬ জানুয়ারি ২০২০ | প্রিন্ট  | 543

হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী সুস্বাদু পানীয় খেজুরের রস ও গুড়

আমাদের বাংলাদেশ বৈচিত্র্যময় এক আবহাওয়ার দেশ। আমাদের রয়েছে ছয়টি বৈচিত্র্যময় ঋতু।আর এই প্রত্যেক ঋতুর রয়েছে আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য।ছয়টি ঋতুর অন্যতম একটি ঋতু হচ্ছে হেমন্ত।আর এই হেমন্তের ছোঁয়ায় আগমন ঘটে শীতের ।

এই শীতে একসময় ব্যস্তসময় পার করতো খেজুরের রস সংগ্রহকারী গাছিরা। সকালে ঘুম থেকে উঠলেই মিষ্টি রোদে দেখা মিলতো গাছিদের রস বিক্রির দল। তবে সময়ের পরিক্রমায় আধুনিক নগরায়নের ফলে হারিয়ে যাচ্ছে খেজুর গাছ এবং গাছের রস। এখন আর দেখা পাওয়া যায়না গাছিদের দল বেধে রস বিক্রির হাকডাক। হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী সুস্বাদু পানীয় এবং খেজুর গাছ।


শীতের সকালে মিষ্টি রোদে বসে মিষ্টি সুস্বাদু খেজুরের রস খাওয়ার মজাই আলাদা।কিন্তু এখন আর মিষ্টি রোদে তেমন একটা পাওয়া যায়না শীতের সুস্বাদু পানীয় খেজুরের রস।
শীত মৌসুমের শুরুতেই গাজীপুরের বিভিন্ন উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় খেজুর গাছের রস সংগ্রহের কাজে ব্যস্ত সময় পার করেন গাছিরা। শীত মৌসুমের প্রতিদিনই সকালে গাছিদের খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করতে দেখা যায়।এক সময় এই পেশার ওপর অনেক মানুষ নির্ভরশীল ছিল । তবে পূর্বের তুলনায় বর্তমানে খেজুর গাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ায় এই খেজুরের রসের ঐতিহ্য দিন দিন হারিয়ে যেতে বসেছে।

এক সময় গাজীপুর জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রচুর পরিমানে খেজুর গাছ ছিল ।কিন্তু বর্তমানে সভ্যতার ক্রমবর্ধমান নগরায়নের ফলে খেজুর গাছের সংখ্যা অনেকটাই কমে গেছে। সেই সাথে কমে গেছে রস সংগ্রহের গাছির সংখ্যাও।

খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহের নিয়ম হলো প্রথমে খেজুর গাছের মাথার অংশের কাছাকাছি ভালো করে পরিস্কার করে গাছের ভেতরের রস বের করার জন্য গাছের সাদা অংশ বের করতে হবে। এরপর পরিস্কার করা সেই সাদা অংশ থেকে বিশেষ কায়দায় ছোট-বড় মাটির পাত্র যেমন ঘটি, কলস ইত্যাদি দিয়ে রস সংগ্রহ করা হয়। ছোট বড় বিভিন্ন রকমের খেজুর গাছ অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়েই গাছিদের কোমরে মোটা রশি বেঁধে গাছে ঝুলে খেজুর গাছের রস সংগ্রহের কাজ করতে হয়। গাছিরা প্রতিদিন বিকেলে খেজুর গাছের সাদা অংশ পরিস্কার করে ছোট-বড় কলসি বাঁধে রসের জন্য। আবার কাকভোরে গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে নিয়ে যায় বিভিন্ন এলাকায়। কেউ কেউ এই রস এলাকার বিভিন্ন স্থানে ও হাটে-বাজারে (কাচা রস)খাওয়ার জন্য বিক্রয় করে আবার কেউ কেউ সকালেই এই রস দিয়ে বিভিন্ন রকমের পাটালি ও রসালু গুড় তৈরী করার কাজ শুরু করেন। গ্রামের অনেক মানুষ শীতের সকালে সুস্বাদু এই খেজুরের রস ও খেজুর রসের তৈরি গুড় নেওয়ার জন্য অপেক্ষায় থাকে। যা দিয়ে তৈরী হয় মুখরোচক খাবার পায়েস ও হরেক রকমের পিঠা।

সরেজমিনে গিয়ে কথা হয় শ্রীপুর উপজেলার আবদার গ্রামের প্রয়াত আব্দুল বারেকের ছেলে বাদশাহর সাথে (২৫) সাথে। তার সাথে কথা বলে জানা যায়, সে তার বাবাকে রস সংগ্রহ করতে দেখেছে সেই ছোটবেলা থেকেই। তখন প্রচুর রস আসতো বাড়ীতে। খেজুরের গুড়ের গন্ধে মৌ মৌ করতে পুরো বাড়ি কিন্তু বর্তমানে গাছের সংখ্যা একেবারেই কমে গেছে। একসময় তারা কয়েকশো খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করতো কিন্তু এ বছর মাত্র ২০- ২৫ টি গাছ থেকে রস সংগ্রহ করছে।

রস সংগ্রাহক উজিলাব গ্রামের আরিফ বলেন, আগে অনেক গাছ থেকে রস সংগ্রহ করতাম কিন্তু এখন গাছও নাই তেমন রসও সংগ্রহ করতে পারিনা। কয়েকটা গাছ কেটেছি শুধু নিজের পরিবারের খাওয়ার জন্য। গাছ তো নাই তাই আগের মত রস সংগ্রহ করতে পারিনা।

শ্রীপুরের গাজীপুর ইউনিয়নের গাজীপুর গ্রামের মৃত বেছু সেখের ছেলে ছাবেদ আলী মুন্সী বলেন, প্রায় ৪০-৪৫ বছর ধরে রস সংগ্রহ করে আসছি। পূর্বের তুলনায় বর্তমানে দিন দিন খেজুর গাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এতে আমরা আর্থিক ভাবে অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছি।

সাধারণত একটি খেজুর গাছের রসের উপযুক্ত হতে প্রায় ৫-১০ বছর সময় লেগে যায়।আর একটি গাছ থেকে রস পাওয়া ২০-২৫ বছর পর্যন্ত। তবে প্রতিটি গাছে কি পরিমাণ রস পাওয়া যাবে তা নির্ভর করে গাছীর দক্ষতা এবং গাছের উপর।

খেজুরের রস একটি উপকারী পানীয়।এতে রয়েছে প্রচুর এনার্জি বা শক্তি রয়েছে। এই রসকে প্রাকৃতিক ‘এনার্জি ড্রিংক’ও বলা যেতে পারে। এই রসে গ্লুকোজের পরিমাণ বেশি থাকে।খেজুরের রস কাঁচা খাওয়া যায়, আবার জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি করেও খাওয়া যায়। গুড়ে প্রচুর পরিমানে আয়রন থাকে যা হিমোগ্লোবিন তৈরিতে সহায়তা করে।

সাধারণত যারা শারীরিক দুর্বলতায় ভোগেন, খেজুরের রস তাঁদের জন্য দারুণ উপকারী। খেজুরের রস প্রচুর খনিজ ও পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ।

খেজুরের রস চুলায় জাল দিয়ে তৈরি করা হয় পাটালী গুড়। খেজুরের রসের এই নতুন পাটালী গুর দিয়ে তৈরি করা হয় মজাদার শীতকালীন বিভিন্ন রকমের পিঠা ও পায়েশ। খেজুরের রসে তৈরি জনপ্রিয় পিঠার মধ্যে বাপা পিঠা, খেজুরের রসের দুধচিতই পিঠা সকলের কাছে প্রিয়।

জনসাধারণের সাথে কথা বললে তারা আফসোস করে বলেন, আগে শীতের দিন আসলে মিষ্টি রোদে বসে খেজুরের রস খেতাম। কিন্তু এখন সারা গ্রাম খুজেও কোথাও খেজুরের গাছ এবং গাছী কারো সন্ধান পাওয়া যায় না। তাই আমাদের সকলেরই খেজুর গাছ লাগানোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে। আর তা না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম খেজুরের রসের কথা শুধু বই পুস্তকে পড়বে কিন্তু বাস্তবে তা পাবে না।

শেয়ার করুন..

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এক ক্লিকে বিভাগের খবর

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০৩১  
ঘোষনা : আমাদের পূর্বকন্ঠ ওয়েবসাইটে প্রবেশ করার জন্য আপনাকে স্বাগতম। আপনার আশপাশে ঘটে যাওয়া খবরা খবর জানাতে আমাদের ফোন করুন-০১৭১৩৫৭৩৫০২ এই নাম্বারে ☎ গুরুত্বপূর্ণ নাম্বার সমূহ : ☎ জরুরী সেবা : ৯৯৯ ☎ নেত্রকোনা ফায়ার স্টেশন: ০১৭৮৯৭৪৪২১২☎ জেলা প্রশাসক ,নেত্রকোনা:০১৩১৮-২৫১৪০১ ☎ পুলিশ সুপার,নেত্রকোনা: ০১৩২০১০৪১০০☎ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, সদর সার্কেল : ০১৩২০১০৪১৪৫ ☎ ইউএনও,পূর্বধলা : ০১৭৯৩৭৬২১০৮☎ ওসি পূর্বধলা : ০১৩২০১০৪৩১৫ ☎ শ্যামগঞ্জ পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র : ০১৩২০১০৪৩৩৩ ☎ ওসি শ্যামগঞ্জ হাইওয়ে থানা : ০১৩২০১৮২৮২৬ ☎ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা, পূর্বধলা: ০১৭০০৭১৭২১২/০৯৫৩২৫৬১০৬ ☎ উপজেলা সমাজসেবা অফিসার, পূর্বধলা : ০১৭১৮৩৮৭৫৮৭/০১৭০৮৪১৫০২২ ☎ উপজেলা মৎস্য অফিসার, পূর্বধলা : ০১৫১৫-৬১৪৯২১ ☎ উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা, পূর্বধলা : ০১৯৯০-৭০৩০২০ ☎ উপজেলা প্রাণি সম্পদ অফিসার, পূর্বধলা : ০১৭১৮-৭২৮২৯৪ ☎ উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) পূর্বধলা :০১৭০৮-১৬১৪৫৭ ☎ উপজেলা আনসার ভিডিপি অফিসার, পূর্বধলা : ০১৯১৪-৯১৯৯৩৮ ☎ উপ-সহকারি প্রকৌশলী, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিস, পূর্বধলা : ০১৯১৬-৮২৬৬৬৮ ☎ উপজেলা যুব উন্নয়ন অফিসার, পূর্বধলা : ০১৭১১-৭৮৯৭৯৮ ☎ উপজেলা কৃষি অফিসার, পূর্বধলা : ০১৭১৬-৭৯৮৯৪৬ ☎ উপজেলা শিক্ষা অফিসার, পূর্বধলা : ০১৭১৫-৪৭৪২৯৬ ☎ উপজেলা সমবায় অফিসার, পূর্বধলা : ০১৭১৭-০৪৩৬৩৯ ☎ সম্পাদক পূর্বকন্ঠ ☎ ০১৭১৩৫৭৩৫০২ ☎
মোঃ শফিকুল আলম শাহীন সম্পাদক ও প্রকাশক
পূর্বকণ্ঠ ২০১৬ সালে তথ্য অধিদপ্তরে নিবন্ধনের জন্য আবেদিত।
বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয়

স্টেশন রোড, পূর্বধলা, নেত্রকোনা।

হেল্প লাইনঃ +৮৮০৯৬৯৬৭৭৩৫০২

E-mail: info@purbakantho.com