নেত্রকোনা ০৪:১৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ৯ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

শ্রীবরদীর সাব রেজিষ্টার বসেন খাস কামরায়, সেখানেই চলে দলিল সম্পাদন

  • আপডেট : ০৭:৫১:৪৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অগাস্ট ২০১৯
  • ২৩৬

মো. আব্দুল বাতেন,শ্রীবরদী (শেরপুর) প্রতিনিধি:

তিনি এজলাসে বসেন না। বসেন খাস কামরায়। সেখানেই চলে দলিল সম্পাদন। জমির ক্রেতা বিক্রেতাদের খাস কামরার বাইরে রেখে অধিকাংশ দলিল সম্পাদন করা হয়। শুধু দলিল লেখকরাই থাকেন সেখানে। প্রয়োজনে ডেকে নেয়া হয় ক্রেতা বা বিক্রেতাকে। ঘুষ লেনদেন আগে ছিল সিক্রেট। এখন প্রকাশেই চলে দরদাম আর লেনদেন। এছাড়াও এজলাসের পাশে টেবিল চেয়ার নিয়ে বসানো হয়েছে একজনকে। তিনি প্রতি দলিলে নেন অতিরিক্ত দুই হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা।

এছাড়াও সময় মতো অফিসে না আসায় চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন জমি দাতা গ্রহিতারা। সম্প্রতি শেরপুরের শ্রীবরদী সাব-রেজিষ্ট্রি অফিসে গেলে জমি ক্রেতা-বিক্রেতা, ভুক্তভোগি, দলিল লেখক ও অফিসে কর্মরতদের মধ্যে অনেকের সাথে কথা বলে ও অভিযোগে ওঠে আসে এমন তথ্য।

জানা যায়, দীর্ঘদিন যাবত শ্রীবরদী সাব-রেজিষ্টি অফিসে চলছে নানা অনিয়ম দুর্নীতি। উপজেলা সাব-রেজিষ্টার মো. আব্দুর রহমান ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তবে সম্প্রতি বেড়ে গেছে লেনদেনের মাত্রা। দলিল রেজিষ্ট্রি হলেই গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা। সবই চলছে সাব রেজিষ্টারের নামে। কাগজপত্র সঠিক থাকলেও প্রতি দলিলে নেয়া হচ্ছে দুই হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা। তবে দলিল রেজিষ্ট্রি করতে যে সব কাগজের প্রয়োজন তার কোনোটির ফটোকপি দেয়া হলে গুনতে হয় আরো বাড়তি টাকা। অতিরিক্ত টাকার বিনিময়ে কখনো পরিবর্তন হয় জমির শ্রেনী বিভাগ।

এছাড়াও জাতীয় পরিচয়পত্র পুরাতন হলে এমনকি একাধিক খতিয়ানসহ নানা অজুহাতে চলে বাড়তি টাকার লেনদেন। এতে অনেকে হচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্ত। মোটা অংকের রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন দলিল লেখক জানান, ২০০৮ সালের পর যে সব জাতীয় পরিচয় পত্র হয়েছে সেসব জাতীয় পরিচয়পত্রধারী ক্রেতা বিক্রেতাকে গুণতে হচ্ছে বাড়তি আরো ৫শ থেকে ১ হাজার টাকা। ভায়া দলিল সম্পাদনে দিতে হয় আরো ৫শ টাকা। এছাড়াও সাব-রেজিষ্টার সপ্তাহে দুই দিন বসেন অফিসে। এর মধ্যেও অফিসের আসেন বেলা ১২টার পর। বিকাল ৫টা হলেই শুরু হয় লেট ফি।

সূত্র জানায়, গত মঙ্গলবার ও বুধবার দুই দিনে প্রায় ২শ দলিল সম্পাদন হয়েছে। এর মধ্যে ভূমিহীন পরিবারের বন্দোবস্ত ৭টি দলিল সম্পাদন না করেই ড্রয়ারে রেখে দেন সাব রেজিষ্টার। উপজেলার মলামারী গ্রামের বয়োবৃদ্ধ হতদরিদ্র তারা মিয়া ও চান মিয়া জানান, তারা দুই দিনই ঘুরে গেলেন। অতিরিক্ত টাকা না দেয়ায় তাদের দলিল সম্পাদন হয়নি। এভাবেই অনেকে হচ্ছেন হয়রানীর শিকার।

এসব বিষয়ে অভিযোগ তুলে প্রায় দুই মাস আগে দলিল লেখকরা সাব-রেজিষ্ট্রি অফিসের সামনের সড়কে মানব বন্ধন করেছে। পরে দলিল লেখকরা বিষয়টি অবহিত করেছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে। এ ব্যাপারে সাবÑরেজিষ্টার ও দলিল লেখকদের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে বলে এই প্রতিনিধিকে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেঁজুতি ধর। তবে আজো সাব রেজিষ্টারের ওইসব দুর্নীতি অনিয়মের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপের খবর পাওয়া যায়নি। উপজেলা দলিল লেখক সমিতির সাবেক সাধারন সম্পাদক নুরুজ্জামান ফুলুসহ অনেকে বলেন, আমরা সাবÑরেজিষ্টারের অধীনে কাজ করি। এর পরেও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিলাম। তবে কোনো বিচার পাইনি। বাধ্য হয়ে তার কথা মতো দলিল সম্পাদন করতে হচ্ছে।

এজলাসে না বসে খাস কামড়ায় দলিল রেজিষ্ট্রির সত্যতা স্বীকার করেছেন উপজেলা সাব-রেজিষ্টার মো. আব্দুর রহমান ভূঁইয়া। তিনি দুর্নীতি অনিয়ম অস্বীকার করে বলেন, নিয়ম মাফিক দলিল রেজিষ্টি হচ্ছে। দলিল রেজিষ্ট্রি করতে যেসব কাগজ পত্র প্রয়োজন তা না থাকায় কতিপয় দলিল বাতিল করা হয়। এ কারণে দলিল লেখকরা তার বিরুদ্ধে মাঝে মধ্যেই অভিযোগ তুলেন। তিনি আরো বলেন, আমি কোনো অনিয়ম দুর্নীতি করে থাকলে কর্তৃপক্ষ আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেক।

তবে তিনি আগামি সপ্তাহ থেকে আরো একদিন বেশি আসবেন বলেও জানান। বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের তদন্ত পূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার দাবি তুলেছেন ভুক্তভোগিরা। জেলা রেজিস্ট্রার সেলিম উদ্দিন তালুকদার বলেন, শ্রীবরদীর সাব-রেজিস্ট্রারের এজলাসে না বসে দলিল সম্পাদনের বিষয়টি আমি অবগত ছিলাম না। পরবর্তীতে অফিস চলাকালীন সময়ে এজলাসে না বসলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

প্রকাশক ও সম্পাদক সম্পর্কে-

আমি মো. শফিকুল আলম শাহীন। আমি একজন ওয়েব ডেভেলপার ও সাংবাদিক । আমি পূর্বকণ্ঠ অনলাইন প্রকাশনার সম্পাদক ও প্রকাশক। আমি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইতিবাচক। আমি করতে, দেখতে এবং অভিজ্ঞতা করতে পছন্দ করি এমন অনেক কিছু আছে। আমি আইটি সেক্টর নিয়ে বিভিন্ন এক্সপেরিমেন্ট করতে পছন্দ করি। যেমন ওয়েব পেজ তৈরি করা, বিভিন্ন অ্যাপ তৈরি করা, অনলাইন রেডিও স্টেশন তৈরি করা, অনলাইন সংবাদপত্র তৈরি করা ইত্যাদি। আমাদের প্রকাশনা “পূর্বকন্ঠ” স্বাধীনতার চেতনায় একটি নিরপেক্ষ জাতীয় অনলাইন । পাঠক আমাদের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরনা। পূর্বকণ্ঠ কথা বলে বাঙালির আত্মপ্রত্যয়ী আহ্বান ও ত্যাগে অর্জিত স্বাধীনতার। কথা বলে স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে। ছড়িয়ে দিতে এ চেতনা দেশের প্রত্যেক কোণে কোণে। আমরা রাষ্ট্রের আইন কানুন, রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল। দেশপ্রেম ও রাষ্ট্রীয় আইন বিরোধী এবং বাঙ্গালীর আবহমান কালের সামাজিক সহনশীলতার বিপক্ষে পূর্বকন্ঠ কখনো সংবাদ প্রকাশ করে না। আমরা সকল ধর্মমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, কোন ধর্মমত বা তাদের অনুসারীদের অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে আমরা কিছু প্রকাশ করি না। আমাদের সকল প্রচেষ্টা পাঠকের সংবাদ চাহিদাকে কেন্দ্র করে। তাই পাঠকের যে কোনো মতামত আমরা সাদরে গ্রহন করব।

শ্রীবরদীর সাব রেজিষ্টার বসেন খাস কামরায়, সেখানেই চলে দলিল সম্পাদন

আপডেট : ০৭:৫১:৪৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অগাস্ট ২০১৯

মো. আব্দুল বাতেন,শ্রীবরদী (শেরপুর) প্রতিনিধি:

তিনি এজলাসে বসেন না। বসেন খাস কামরায়। সেখানেই চলে দলিল সম্পাদন। জমির ক্রেতা বিক্রেতাদের খাস কামরার বাইরে রেখে অধিকাংশ দলিল সম্পাদন করা হয়। শুধু দলিল লেখকরাই থাকেন সেখানে। প্রয়োজনে ডেকে নেয়া হয় ক্রেতা বা বিক্রেতাকে। ঘুষ লেনদেন আগে ছিল সিক্রেট। এখন প্রকাশেই চলে দরদাম আর লেনদেন। এছাড়াও এজলাসের পাশে টেবিল চেয়ার নিয়ে বসানো হয়েছে একজনকে। তিনি প্রতি দলিলে নেন অতিরিক্ত দুই হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা।

এছাড়াও সময় মতো অফিসে না আসায় চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন জমি দাতা গ্রহিতারা। সম্প্রতি শেরপুরের শ্রীবরদী সাব-রেজিষ্ট্রি অফিসে গেলে জমি ক্রেতা-বিক্রেতা, ভুক্তভোগি, দলিল লেখক ও অফিসে কর্মরতদের মধ্যে অনেকের সাথে কথা বলে ও অভিযোগে ওঠে আসে এমন তথ্য।

জানা যায়, দীর্ঘদিন যাবত শ্রীবরদী সাব-রেজিষ্টি অফিসে চলছে নানা অনিয়ম দুর্নীতি। উপজেলা সাব-রেজিষ্টার মো. আব্দুর রহমান ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তবে সম্প্রতি বেড়ে গেছে লেনদেনের মাত্রা। দলিল রেজিষ্ট্রি হলেই গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা। সবই চলছে সাব রেজিষ্টারের নামে। কাগজপত্র সঠিক থাকলেও প্রতি দলিলে নেয়া হচ্ছে দুই হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা। তবে দলিল রেজিষ্ট্রি করতে যে সব কাগজের প্রয়োজন তার কোনোটির ফটোকপি দেয়া হলে গুনতে হয় আরো বাড়তি টাকা। অতিরিক্ত টাকার বিনিময়ে কখনো পরিবর্তন হয় জমির শ্রেনী বিভাগ।

এছাড়াও জাতীয় পরিচয়পত্র পুরাতন হলে এমনকি একাধিক খতিয়ানসহ নানা অজুহাতে চলে বাড়তি টাকার লেনদেন। এতে অনেকে হচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্ত। মোটা অংকের রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন দলিল লেখক জানান, ২০০৮ সালের পর যে সব জাতীয় পরিচয় পত্র হয়েছে সেসব জাতীয় পরিচয়পত্রধারী ক্রেতা বিক্রেতাকে গুণতে হচ্ছে বাড়তি আরো ৫শ থেকে ১ হাজার টাকা। ভায়া দলিল সম্পাদনে দিতে হয় আরো ৫শ টাকা। এছাড়াও সাব-রেজিষ্টার সপ্তাহে দুই দিন বসেন অফিসে। এর মধ্যেও অফিসের আসেন বেলা ১২টার পর। বিকাল ৫টা হলেই শুরু হয় লেট ফি।

সূত্র জানায়, গত মঙ্গলবার ও বুধবার দুই দিনে প্রায় ২শ দলিল সম্পাদন হয়েছে। এর মধ্যে ভূমিহীন পরিবারের বন্দোবস্ত ৭টি দলিল সম্পাদন না করেই ড্রয়ারে রেখে দেন সাব রেজিষ্টার। উপজেলার মলামারী গ্রামের বয়োবৃদ্ধ হতদরিদ্র তারা মিয়া ও চান মিয়া জানান, তারা দুই দিনই ঘুরে গেলেন। অতিরিক্ত টাকা না দেয়ায় তাদের দলিল সম্পাদন হয়নি। এভাবেই অনেকে হচ্ছেন হয়রানীর শিকার।

এসব বিষয়ে অভিযোগ তুলে প্রায় দুই মাস আগে দলিল লেখকরা সাব-রেজিষ্ট্রি অফিসের সামনের সড়কে মানব বন্ধন করেছে। পরে দলিল লেখকরা বিষয়টি অবহিত করেছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে। এ ব্যাপারে সাবÑরেজিষ্টার ও দলিল লেখকদের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে বলে এই প্রতিনিধিকে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেঁজুতি ধর। তবে আজো সাব রেজিষ্টারের ওইসব দুর্নীতি অনিয়মের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপের খবর পাওয়া যায়নি। উপজেলা দলিল লেখক সমিতির সাবেক সাধারন সম্পাদক নুরুজ্জামান ফুলুসহ অনেকে বলেন, আমরা সাবÑরেজিষ্টারের অধীনে কাজ করি। এর পরেও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিলাম। তবে কোনো বিচার পাইনি। বাধ্য হয়ে তার কথা মতো দলিল সম্পাদন করতে হচ্ছে।

এজলাসে না বসে খাস কামড়ায় দলিল রেজিষ্ট্রির সত্যতা স্বীকার করেছেন উপজেলা সাব-রেজিষ্টার মো. আব্দুর রহমান ভূঁইয়া। তিনি দুর্নীতি অনিয়ম অস্বীকার করে বলেন, নিয়ম মাফিক দলিল রেজিষ্টি হচ্ছে। দলিল রেজিষ্ট্রি করতে যেসব কাগজ পত্র প্রয়োজন তা না থাকায় কতিপয় দলিল বাতিল করা হয়। এ কারণে দলিল লেখকরা তার বিরুদ্ধে মাঝে মধ্যেই অভিযোগ তুলেন। তিনি আরো বলেন, আমি কোনো অনিয়ম দুর্নীতি করে থাকলে কর্তৃপক্ষ আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেক।

তবে তিনি আগামি সপ্তাহ থেকে আরো একদিন বেশি আসবেন বলেও জানান। বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের তদন্ত পূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার দাবি তুলেছেন ভুক্তভোগিরা। জেলা রেজিস্ট্রার সেলিম উদ্দিন তালুকদার বলেন, শ্রীবরদীর সাব-রেজিস্ট্রারের এজলাসে না বসে দলিল সম্পাদনের বিষয়টি আমি অবগত ছিলাম না। পরবর্তীতে অফিস চলাকালীন সময়ে এজলাসে না বসলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।