নেত্রকোনা ০৮:৩১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

কুষ্টিয়ায় হাজারো বাউল সাধু আর ফকিরের পদচারনায় মুখর আঁখড়াবাড়ি

  • আপডেট : ০১:১০:৫৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯
  • ১১৯৩ বার পঠিত

নজরুল ইসলাম মুকুল, কুষ্টিয়া :

‘ এবার আইনা চলে, ঘুমটা ফেলে, নয়ন ভরে দেখ, ও তুই নয়ন ভরে দেখ, ও তুই সরল হয়েই থাক’। লালনের গানের এ মর্মবানী বলেই দেয় যে বাউলরা, সাধু সহজ ও সরল পথের সন্ধান করেন। আর সরল জীবন-যাপন করেন। আর তাই লালন অনুসারীদের মতে সহজ ও সরল পথের তালাশ করলেই সহজ মানুষ হওয়া যায়।

তাইতো এ পথের সন্ধানে অনেকেই সংসারত্যাগী হন। হাজারো বাউল, সাধু, ফকির আর দর্শার্থীরা পদভারে মুখরিত হয়ে উঠেছে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়ার মরা কালিনদীর পাড়ে লালন আঁখড়া বাড়ি। বাউল স¤্রাট ফকির লালন শাহের ১২৯তম তিরোধনা দিবসকে কেন্দ্র করে গতকাল থেকে শুরু হয়েছে তিনদিনের উৎসব। জেলা প্রশাসন, লালন একাডেমী ও সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে তিন দিনব্যাপী চলছে উৎসব ও গ্রামীণ মেলা।

অনুষ্ঠান শুরুর দিন থেকেই ছেঁউড়িয়া গ্রামে মরাকালি নদীর পাড়ে বিশাল মাঠে পা ফেলার মত জায়গা নেই। হাজারো বাউল, সাধু আর ফকিরের পদচারনায় মুখর লালন আঁখড়াবাড়ি। লালনের মাজার প্রাঙ্গণ ছাড়াও সামনের বিশাল প্রান্তরে আসন গেড়েছে দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা লালন ভক্তরা।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, পুরো লালন বাড়ি বাউল, সাধু আর ফকিরদের দখলে। পাশাপাশি অসংখ্য দর্শনার্থী মিলেছেন তাদের সাথে। লালন মাজার সংলগ্ন একাডমেীর নিচেই প্রবীণ বাউলের জমজমাট আড্ডা। এছাড়া মাজারের সাথে মাঠেও জড়ো হয়েছেন দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা বাউল সাধুরা। প্রবীণ থেকে শুরু করে নানা বয়সী বাউলের দেখা মেলে মাজারে।
ফরিদপুর থেকে আসা নিজাম উদ্দিন জানান, মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি। তাইতো মানুষের মাঝে লালন ফকির কোন ভেদাভেদ দেখেননি, তিনি সকলকে ভাল বাসতেন। মহান সৃষ্টিকর্তা তার সৃষ্টিকুলতে ভালবাসতে বলেছেন, সবার পাশে তিনি দাঁড়াতে বলেছেন। তাই মানুষে মানুষে কোন ভেদাভেদ নেই। সবাই যদি এ মনোভাব নিয়ে চলতো তাহলে সব হানাহানি, মারামারি ও হিংসা বন্ধ হয়ে যেত।’

লালনের এ উৎসব ঘিরে নানা রকমের লোকজনের আগাগোনা বাড়ে মাজার আঙ্গিনায়। অনেকে এক সপ্তাহ আগে চলে আসে। কোন দাওয়াত দেয়া লাগে না।

দৌলতপুর থেকে আসা বাউল মতিয়ার হোসেন বলেন, কিসের দাওয়াত, আমাদের কোন দাওয়াত লাগে না। দাওয়াত তো মনের ভিতর গেঁথে আছে। ৩৩ বছর ধরে আসছি। তাইতো মনের টানেই চলে আসি।এখানে আসলে ভাল লাগে বলে জানান তিনি।’
একাডেমীর নিচে গোল হয়ে খন্ড খন্ড বসে গানের মজমা বসিয়েছেন বাউলরা। সুর তুলেছে বাদ্যযন্ত্রে। একজন বাউল গান ধরে। দু’একটি গান শেষ করার পর পাশে বসা অন্য বাউলরা গান ধরেন। এভাবেই চলছে রাতদিন। দর্শনার্থীরাও পাশে বসে গোল গানে মজে থাকেন। সবার কন্ঠেই লালনের গান। শব্দে স্পষ্ট বোঝা যায় না। মাথা দুলিয়ে নেচে গেয়ে নানা অঙ্গভঙ্গিতে আনন্দ প্রকাশ করে একাকার সাধুরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দর্শনে অনার্স মাষ্টার্স করা বাউল হৃদয় শাহ এ বছরও আসন পেতেছেন একাডেমীর নিচে। সঙ্গে তার সঙ্গীনিও আছেন। কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি লালনের একজন ভক্ত। তিনি বলেন, হাওয়ার সন্ধান করতে হবে। দম ছাড়া কোন কিছু সাধন হবে না। মানব ধর্মে একটি মর্ম বানী আমি শিখেছি, আর তা হলো সময় সত্য কথা বল এবং সত্যকে অনুসন্ধান কর।’
ঢাকা থেকে আরেক বাউল আজিম উদ্দিন বলেন, আমি লালনের একজন ক্ষুদ্র অনুসারী। তবে এতদিনে যা বুঝতে পেরেছি তাহলো মনকে সফেদ করতে হবে। মন ভাল হলে তার সব ভাল। তাই ভালকে পেতে হলে আলোর সন্ধান করতে হবে। তাহলেই মানুষ জগত সংসারে সব পেয়ে যাবে।’

লালন একাডেমীর পক্ষ থেকে আয়োজনের কমতি নেই। বাউল থাকা ও খাওয়ার জন্য সব ধরনের আয়োজন করা হয়েছে। পর্যাপ্ত টয়লেট ও বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে।

কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমীর সভাপতি মো. আসলাম হোসেন জানান, লালন সব সময় সত্য অনুসন্ধান করেছে। তিনি মানুষের সেবা করে গেছেন। তার গানেও এসব বিষয় প্রকাশ পাই। তিনি বলেন, অনুষ্ঠানকে বর্নিল করে তুলতে কোন কিছুর ঘাটতি রাখা হয়নি বলে জানান তিনি।’

বাউলরা জানান, বাল্য সেবা ও পূর্ণ সেবা মাঠে বসেই সারেন তারা। একাডেমীর পক্ষ থেকে তাদের খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। এক সাথে কয়েক হাজার বাউল খাবার গ্রহণ করেন।

শিল্পীরা জানান, একের পর বাউল দল গাইতে থাকে গান। রাত গভীর হয়। কিন্তু মানুষের আগ্রহে মোটেও ভাটা পড়ে না। সারাদেশ থেকে এত বাউলদল আসে যে ভোররাতে কোনমতে তাদের গান বন্ধ করা যায়। সাধুদের খানা পিনাতেও আছে বৈচিত্র। প্রথম দিনের মধ্যরাতে দেয়া হয়েছে খেঁচুরির সাথে সবজি। আজ বৃহস্পতিবার সকালে পায়েস ক্ষীর। দুুপুরে বেলাতে দেয়া হয় পূর্ণসেবা-ভাত, মাছভাজা সবজি, ডাল আর দই।

ফকির লালন শাহ ১৮৯০ সালে কুমারখালীর ছেঁউড়িয়া আঁখড়া বাড়িতে দেহত্যাগ করে। তারপর থেকে তার শিষ্য ও ভক্তরা দিবসটি উৎযাপন করে আসছে।’

আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

প্রকাশক ও সম্পাদক সম্পর্কে-

শফিকুল আলম শাহীন

আমি একজন ওয়েব ডেভেলপার ও সাংবাদিক। আমি দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় পূর্বধলা উপজেলা সংবাদদাতা হিসেবে কর্মরত । সেইসাথে পূর্বকণ্ঠ অনলাইন প্রকাশনার সম্পাদক ও প্রকাশক। আমার বর্তমান ঠিকানা স্টেশন রোড, পূর্বধলা, নেত্রকোনা। আমি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইতিবাচক। আমার ধর্ম ইসলাম। আমি করতে, দেখতে এবং অভিজ্ঞতা করতে পছন্দ করি এমন অনেক কিছু আছে। আমি আইটি সেক্টর নিয়ে বিভিন্ন এক্সপেরিমেন্ট করতে পছন্দ করি। যেমন ওয়েব পেজ তৈরি করা, বিভিন্ন অ্যাপ তৈরি করা, রেডিও স্টেশন তৈরি করা, অনলাইন সংবাদপত্র তৈরি করা ইত্যাদি। প্রয়োজনে: ০১৭১৩৫৭৩৫০২

কুষ্টিয়ায় হাজারো বাউল সাধু আর ফকিরের পদচারনায় মুখর আঁখড়াবাড়ি

আপডেট : ০১:১০:৫৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯

নজরুল ইসলাম মুকুল, কুষ্টিয়া :

‘ এবার আইনা চলে, ঘুমটা ফেলে, নয়ন ভরে দেখ, ও তুই নয়ন ভরে দেখ, ও তুই সরল হয়েই থাক’। লালনের গানের এ মর্মবানী বলেই দেয় যে বাউলরা, সাধু সহজ ও সরল পথের সন্ধান করেন। আর সরল জীবন-যাপন করেন। আর তাই লালন অনুসারীদের মতে সহজ ও সরল পথের তালাশ করলেই সহজ মানুষ হওয়া যায়।

তাইতো এ পথের সন্ধানে অনেকেই সংসারত্যাগী হন। হাজারো বাউল, সাধু, ফকির আর দর্শার্থীরা পদভারে মুখরিত হয়ে উঠেছে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়ার মরা কালিনদীর পাড়ে লালন আঁখড়া বাড়ি। বাউল স¤্রাট ফকির লালন শাহের ১২৯তম তিরোধনা দিবসকে কেন্দ্র করে গতকাল থেকে শুরু হয়েছে তিনদিনের উৎসব। জেলা প্রশাসন, লালন একাডেমী ও সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে তিন দিনব্যাপী চলছে উৎসব ও গ্রামীণ মেলা।

অনুষ্ঠান শুরুর দিন থেকেই ছেঁউড়িয়া গ্রামে মরাকালি নদীর পাড়ে বিশাল মাঠে পা ফেলার মত জায়গা নেই। হাজারো বাউল, সাধু আর ফকিরের পদচারনায় মুখর লালন আঁখড়াবাড়ি। লালনের মাজার প্রাঙ্গণ ছাড়াও সামনের বিশাল প্রান্তরে আসন গেড়েছে দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা লালন ভক্তরা।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, পুরো লালন বাড়ি বাউল, সাধু আর ফকিরদের দখলে। পাশাপাশি অসংখ্য দর্শনার্থী মিলেছেন তাদের সাথে। লালন মাজার সংলগ্ন একাডমেীর নিচেই প্রবীণ বাউলের জমজমাট আড্ডা। এছাড়া মাজারের সাথে মাঠেও জড়ো হয়েছেন দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা বাউল সাধুরা। প্রবীণ থেকে শুরু করে নানা বয়সী বাউলের দেখা মেলে মাজারে।
ফরিদপুর থেকে আসা নিজাম উদ্দিন জানান, মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি। তাইতো মানুষের মাঝে লালন ফকির কোন ভেদাভেদ দেখেননি, তিনি সকলকে ভাল বাসতেন। মহান সৃষ্টিকর্তা তার সৃষ্টিকুলতে ভালবাসতে বলেছেন, সবার পাশে তিনি দাঁড়াতে বলেছেন। তাই মানুষে মানুষে কোন ভেদাভেদ নেই। সবাই যদি এ মনোভাব নিয়ে চলতো তাহলে সব হানাহানি, মারামারি ও হিংসা বন্ধ হয়ে যেত।’

লালনের এ উৎসব ঘিরে নানা রকমের লোকজনের আগাগোনা বাড়ে মাজার আঙ্গিনায়। অনেকে এক সপ্তাহ আগে চলে আসে। কোন দাওয়াত দেয়া লাগে না।

দৌলতপুর থেকে আসা বাউল মতিয়ার হোসেন বলেন, কিসের দাওয়াত, আমাদের কোন দাওয়াত লাগে না। দাওয়াত তো মনের ভিতর গেঁথে আছে। ৩৩ বছর ধরে আসছি। তাইতো মনের টানেই চলে আসি।এখানে আসলে ভাল লাগে বলে জানান তিনি।’
একাডেমীর নিচে গোল হয়ে খন্ড খন্ড বসে গানের মজমা বসিয়েছেন বাউলরা। সুর তুলেছে বাদ্যযন্ত্রে। একজন বাউল গান ধরে। দু’একটি গান শেষ করার পর পাশে বসা অন্য বাউলরা গান ধরেন। এভাবেই চলছে রাতদিন। দর্শনার্থীরাও পাশে বসে গোল গানে মজে থাকেন। সবার কন্ঠেই লালনের গান। শব্দে স্পষ্ট বোঝা যায় না। মাথা দুলিয়ে নেচে গেয়ে নানা অঙ্গভঙ্গিতে আনন্দ প্রকাশ করে একাকার সাধুরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দর্শনে অনার্স মাষ্টার্স করা বাউল হৃদয় শাহ এ বছরও আসন পেতেছেন একাডেমীর নিচে। সঙ্গে তার সঙ্গীনিও আছেন। কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি লালনের একজন ভক্ত। তিনি বলেন, হাওয়ার সন্ধান করতে হবে। দম ছাড়া কোন কিছু সাধন হবে না। মানব ধর্মে একটি মর্ম বানী আমি শিখেছি, আর তা হলো সময় সত্য কথা বল এবং সত্যকে অনুসন্ধান কর।’
ঢাকা থেকে আরেক বাউল আজিম উদ্দিন বলেন, আমি লালনের একজন ক্ষুদ্র অনুসারী। তবে এতদিনে যা বুঝতে পেরেছি তাহলো মনকে সফেদ করতে হবে। মন ভাল হলে তার সব ভাল। তাই ভালকে পেতে হলে আলোর সন্ধান করতে হবে। তাহলেই মানুষ জগত সংসারে সব পেয়ে যাবে।’

লালন একাডেমীর পক্ষ থেকে আয়োজনের কমতি নেই। বাউল থাকা ও খাওয়ার জন্য সব ধরনের আয়োজন করা হয়েছে। পর্যাপ্ত টয়লেট ও বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে।

কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমীর সভাপতি মো. আসলাম হোসেন জানান, লালন সব সময় সত্য অনুসন্ধান করেছে। তিনি মানুষের সেবা করে গেছেন। তার গানেও এসব বিষয় প্রকাশ পাই। তিনি বলেন, অনুষ্ঠানকে বর্নিল করে তুলতে কোন কিছুর ঘাটতি রাখা হয়নি বলে জানান তিনি।’

বাউলরা জানান, বাল্য সেবা ও পূর্ণ সেবা মাঠে বসেই সারেন তারা। একাডেমীর পক্ষ থেকে তাদের খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। এক সাথে কয়েক হাজার বাউল খাবার গ্রহণ করেন।

শিল্পীরা জানান, একের পর বাউল দল গাইতে থাকে গান। রাত গভীর হয়। কিন্তু মানুষের আগ্রহে মোটেও ভাটা পড়ে না। সারাদেশ থেকে এত বাউলদল আসে যে ভোররাতে কোনমতে তাদের গান বন্ধ করা যায়। সাধুদের খানা পিনাতেও আছে বৈচিত্র। প্রথম দিনের মধ্যরাতে দেয়া হয়েছে খেঁচুরির সাথে সবজি। আজ বৃহস্পতিবার সকালে পায়েস ক্ষীর। দুুপুরে বেলাতে দেয়া হয় পূর্ণসেবা-ভাত, মাছভাজা সবজি, ডাল আর দই।

ফকির লালন শাহ ১৮৯০ সালে কুমারখালীর ছেঁউড়িয়া আঁখড়া বাড়িতে দেহত্যাগ করে। তারপর থেকে তার শিষ্য ও ভক্তরা দিবসটি উৎযাপন করে আসছে।’