শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২০, ০১:০৯ পূর্বাহ্ন

স্মৃতির ডায়েরি থেকে

রুদ্র অয়ন :
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ৬:৫৩ অপরাহ্ন
  • ৩৫৪ বার পড়া হয়েছে
বেশ কতক বছর আগের কথা। তখন সবেমাত্র কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র। ডায়েরির দু’এক পাতা লিখছি আর পুনঃ ছিড়ে ফেলে আবার লিখছি। নিজের লেখা দু-একবার পড়ার পর মনে হচ্ছে, ধুত তেরি ছাই; কি সব লিখছি আবোল তাবোল!
‘ভাবনা কাহারে বলে
সখি যাতনা কাহারে কয়,
তোমরা যে বলো দিবস রজনী-
ভালোবাসা ভালোবাসা;
সখি ভালোবাসা কারে কয়
সে কি কেবলই যাতনা ময়……’
প্রিয় শিল্পী সাদি মহম্মদের কণ্ঠে ক্যাসেট প্লেয়ারে (তখন মেমোরি চিফ/মোবাইল ছিলোনা) গানটি শুনছিলেম আর ভাবছিলেম আপন মনে। ভেবে কোনও কুল-কিনারা পাচ্ছিলাম না। লিও টলষ্টয় হলে হয়তোবা চিন্তার সাগর মন্থন করে ‘লাভ এন্ড পীস’ নামের নতুন কোনও গ্রন্থ লিখে ফেলতে পারতাম। সেই যোগ্যতা অভিজ্ঞতার ছিটেফোঁটাওতো আমার মাঝে আছে বলে মনে হয়না। তবু যখন আপন মনে কিছু ভাবি তখন অনেক বিষয় এমন কিছু ভাবনার জন্ম দেয় আমার মনে-অন্তরে, বিবেকের টানে তা না লিখে আর পারিনে! আজকেও হয়েছে তাই।
কতক্ষণ ধরে সাত পাঁচ ভাবছি মনে নেই। হঠাৎ দেয়াল ঘড়িটার দিকে দৃষ্টি পড়তেই চমকে ওঠি। কলেজের সময় প্রায় হয়েগেছে। তড়াক করে লাফিয়ে ওঠে ঝটপট তৈরি হয়ে নিলাম। এরপর পা বাড়ালাম কলেজের দিকে। এক সময় ক্যাম্পাসে প্রবেশ করি।
বিজ্ঞান বিভাগের এক ছেলের সাথে দেখা। বেচারা ছেলেটা এক মেয়ের প্রেমে পড়েছে। পড়াটা ওরই এক তরফা! মেয়েটা ওর প্রেমে পড়েনি। বেচারা দর্দ ভরি দিল নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর পথে- ঘাটে গাল ফুলিয়ে সিগারেট ফুঁকছে! অবশ্য ওর প্রেমে পড়ার আবার কারণও আছে। ছাই না ভস্ম কি যে নাম মেয়েটার মনেই আসছেনা! হুবহু মেম সাহেবের মতো দেখতে মেয়েটি, সাজগোজ মেম সাহেবের মতো তার; আর রাজহাঁসের মতো অহংকারও বটে মেয়েটার। ওর এক ক্লোজ বান্ধবী আমার ঘনিষ্ঠ  বন্ধু। তার মুখ থেকে শুনেছি, মেয়েটি বিনা ঘটনায় নাকি রাস্তায় নামতে পারেনা! এক ছোকরা নাকি মেয়েটার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যে হিরো সেজে বাঘা বাঙালির মতো ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়েছিলো! দু’টো পা নষ্ট। আর একজন নাকি মেয়েটির দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যে আর একজন প্রতিদ্বন্দ্বীর পেটে ছুরি বসিয়ে দিয়েছিলো! একজন গেলো হাসপাতাল, আরেকজন গেলো জেলখানা।
আর এক বিচিত্র পাগলের কথা বলি, ডাবুর মার্কা কয়েকজন ছেলে একটি দল গঠন করেছে! ওদের জাতীয় স্লোগান হচ্ছে- প্রেম চাই, প্রেম চাই, প্রেম করে বাঁচতে চাই। আমাদের প্রতীক কি, ছুঁড়ি ছাড়া আর কী?
 এসব ডাবুর মার্কা ছেলেদের পিটিয়ে ছ্যাচকামো ঘুচিয়ে দেয়ার জন্যে আমি বরাবরই প্রিন্সিপাল স্যারকে অভিযোগ জানিয়ে আসছি। যা দিনকাল পড়ছে জানিনা আমার অভিযোগ আলোর মুখ দেখবে কিনা।
আরেকদিনের ঘটনা। তড়িঘড়ি করে ব্রেকহীন লক্কর ঝক্কর সাইকেল নিয়ে কলেজ এসেছি। গেটের সামনে একদল মেয়ে। সাইকেলও চালাচ্ছিলেম বেপরোয়ার মতো। মোড় ঘুরে গেটের ভেতরে যেই ঢুকেছি অমনি এক মেয়ের সাথে ধাক্কা! আমি তখন সবেমাত্র সাইকেল চালানো শিখেছি, তারওপর ব্রেকহীন লক্কর মার্কা সাইকেল! মেয়েটি হুতোম প্যাঁচার মতো মুখটি গোমড়া করে কিছু বলার আগেই আমি বিনীত স্বরে বললাম, ‘দুঃখিত দিদিমণি। ক্ষমা করবেন, আমি মোড় ঘুরে ভেতরে প্রবেশ করে হুড়োহুড়িতে সামলে ওঠতে পারিনি, I’m extremely sorry.
আমার কথাশুনে কেন জানিনা মেয়েটি রেগে গিয়েও হেসে ফেললো। এ দৃশ্য দেখে বুঝারু লেবেলের একটা ছেলে এসে আমাকে উদ্দেশ্য করে বললো, ‘কি ব্যাপার! মেয়ে মানুষের সাথে ফাজলামো! চিনিস ব্যাটা, অমুক ভায়ের সাথে আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। হাড় মাংস সব এক জায়গায় করে দেবো।’
বলাবাহুল্য, অমুক ভাই হলেন আমাদের কলেজের একজন প্রভাবশালী নেতা। নেতা বলেন দেশের কথা, দশের কথা, গণতন্ত্রের কথা। তার চ্যালার দেখছি স্বৈরাচারী মেজাজ!
মেয়েটিও কাঁচা ধাঁচের নয়। বুঝারু মশাইকে বিরক্তির স্বরে বললো, ‘ও আমার কাজিন। আমাদের মাঝে আপনার নাক গলানোর প্রয়োজন আছে বলে মনে করিনা। আপনি যেতে পারেন।’
চলন্ত কেঁচোর শরীরে আঘাত খেলে কেঁচো যেমন ছোট হয়ে যায়, বুঝারু মাশাইয়ের মুখটাও তেমনি ছোট হয়েগেলো। এদিক ওদিক তাকিয়ে লটপট করে কেটে পড়লো।
আমিও এক সময় সুরসুর করে কেটে পড়ি। এতক্ষণে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। অবশ্য আমি খোলামেলা, পরিচ্ছন্ন মন মানসিকতার মানুষকে ভীষণ পছন্দ করি। যাকগে সেসব কথা। প্রেমে পড়লে প্রথম যে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় তা হলো সাজগোজ। প্রেমিকা পরিপাটি করে চুল বাঁধে আর সাড়ে তিন ঘন্টা ধরে সাজগোজ করে কলেজে আসে। আর প্রেমিক পুরুষ আসে ফুলবাবুটি সেজে।
আমার এক প্রেম দিওয়ানা বন্ধুর কথা বলি। জীবনের প্রথম এক মেয়ের প্রেমে পড়েছে। ওর প্রেমিকার প্রথম চিঠি পেয়ে আমার হাতে দিয়ে বললো, ‘পড়ে দেখ।’ (তখন সেলফোন/এসএমএস/মেইল এসব ছিলোনা।)
মজার মজার নাটকীয় সংলাপে ভরা চিঠিটা পড়ে মনে হলো, প্রেম-প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাসকেও হার মানাবে। মজার ব্যাপারটা হলো, চিঠির শেষে উনি লিপস্টিপ দিয়ে ঠোঁটের ছাপ মেরে দিয়েছেন! কি রোমান্টিক সে চিঠি! সে চিঠি পেয়ে এই প্রেমিক বন্ধুর অবস্থাতো দেখছি ‘হাওয়া মে উড়তা হ্যায়’ হয়ে যাবার যোগার।
আমার কলেজের এক বান্ধবী মাঝে মধ্যে আমাকে আধা পাগল বলে! এই শালা প্রেম দিওয়ানা বন্ধুর সাথে বেশিক্ষণ থাকলে আমি হয়তো সত্যিই সত্যিই পুরোটাই পাগল হয়ে যাবো। আমি চলে যেতে উদ্ধত হলাম। ওকে বললাম- দোস্ত, তুই তোর প্রেমিকাকে কল্পনা কর; আমার কাজ আছে। আমি আসি। তোদের প্রেম ফসল হোক, ওহহো সরি সরি- সফল হোক। গুডবাই।
– রুদ্র অয়ন
এ জাতীয় আরও সংবাদ
এক ক্লিকে বিভাগের খবর

©২০২০ সর্বস্তত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | পূর্বকন্ঠ
কারিগরি সহযোগিতায়- Shahin প্রয়োজনে: ০১৭১৩৫৭৩৫০২

Notice: Undefined index: config_theme in /home/purbakantho/public_html/wp-content/themes/LatestNews/include/root.php on line 33
themesba-lates1749691102