সোমবার, ০১ জুন ২০২০, ০৫:৫৬ অপরাহ্ন

আমাদের পূর্বকন্ঠ ওয়েবসাইটে প্রবেশ করার জন্য আপনাকে স্বাগতম। আমাদের নিয়মিত আপডেট খবর পেতে এখনই ওয়েব পেজটি সাবস্ক্রাইব করুন। আপনার আশপাশে ঘটে যাওয়া খবরা খবর জানাতে আমাদের ফোন করুন-০১৭১৩৫৭৩৫০২ এই নাম্বারে।

একাকিত্বের বেদনা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৩ মে, ২০২০
  • ৫৪ বার পড়া হয়েছে

[ad_1]

পদ্মা নদীবিধৌত পলল দ্বারা গঠিত জেলা শরীয়তপুরের বাসিন্দা শওকত আলী। এক যুগ আগে এক প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে প্রিয়তমা স্ত্রী ও এক পুত্র সন্তানকে হারিয়েছেন। একমাত্র মেয়ে বিবাহ সূত্রে স্বামীর গৃহে আছেন। বিশাল বাড়িতে একাই বসবাস করেন তিনি। স্ত্রীর মৃত্যুর পর মেয়ে ও প্রতিবেশীরা আবার বিয়ে করতে পিড়াপিড়ি করলেও শওকত আলী রাজি হননি।

প্রিয়তমা স্ত্রী গত হলেও তায় জায়গায় নতুন করে কাউকে বসাতে পারবেন না। স্ত্রী রমিজাকে বড্ড ভালোবাসতেন তিনি। বাড়ির পাশেই স্ত্রী ও পুত্রের কবর দিয়েছিলেন। দীর্ঘ দিনের একাকী জীবনে স্ত্রী সন্তানদের কবরই যেন দিন-রাত্রির সঙ্গী। প্রতিটি কাল বৈশাখী ঝড় কিংবা ঘূর্ণিঝড়ের সময়েই শওকত আলীর মনে হয় এই বুঝি তিনিও চলে যাবেন স্ত্রী সন্তানদের কাছে।

বাবার একমাত্র সন্তান ছিলেন শওকত আলী। পৈত্রিক সূত্রে তাই বিশাল বাড়ি ও কয়েক বিঘা সম্পত্তি পেয়েছেন। নিজের জীবনে তেমন কিছু করতে না পারলেও ভালোই চলছিল দিনকাল। কিন্তু স্ত্রী সন্তানকে হারিয়ে অনেকটাই অসহায় হয়ে পড়েছেন তিনি। একাকিত্ব তাকে ছুঁয়ে যায় বার বার। একমাত্র মেয়ে বাবাকে নিজের কাছে নিয়ে যেতে চাইলেও পৈত্রিক ভিটা-বাড়ি ও স্ত্রী সন্তানদের কবর ফেলে কোথাও যেতে চান না শওকত আলী। আবার মেয়েকেও একেবারে নিয়ে আসার সুযোগ নেই।

স্ত্রী সন্তানদের কবর বাড়ির এক পাশে দেওয়ায় পার্শ্ববর্তী বাড়ীর ছোট ছোট ছেলেরাও তেমন আসে না ভয়ে। কারো বাড়িতে দাওয়াত ব্যতীত শওকত আলী নিজেই রান্না করে খেয়ে এসেছে এত দিন। এলাকার লোকজন কারো বাড়িতে নিয়মিত খাবার খেতে বললেও রাজি হয়নি শওকত। তবে আজকাল আর শরীরের চাপ নিতে পারছেন না। ৫৮ বৎসর বয়সে স্ত্রীকে হারানোর পর আজ ৭০ বছর চলছে শওকত আলীর। চাইলেও আগের মতো সব করতে পারছেন না ঠিকমতো।

চেয়ারের হাতলের উপর রাখা চশমাটা চোখে দিয়ে ঘরের বাইরে গিয়ে স্ত্রীর কবরের সামনে দাঁড়িয়ে মনে মনে বলেন শওকত আলী, আমি আর পারছি না রমিজা। সারা জীবন নিজের কাজ নিজে করে চলেছি। তুমি নেই আজ এক যুগ হলো। নিজেই সব করেছি এত দিন। কিন্তু এখন আর পারছি না।

দীর্ঘ দিনের একাকিত্বের মাঝেও শওকত আলীকে একাকিত্ব ভালোভাবেই পেয়ে বসে। কেউ একজন পাশে থাকলে ভালো লাগতো মনে হয় তার। কিন্তু বড্ড দেরি হয়ে গেছে। মেয়েসহ সবাই যখন বলছিল তখন রাজি হয়নি, আর এখন সময় নেই। স্রষ্টার ডাকের অপেক্ষায় শওকত আলী। অবসর থাকার এক জ্বালা, পুরনো স্মৃতি সামনে চলে আসে বার বার। স্মৃতির দহনে পুড়ছেন অনবরত। শরীর ভালো না লাগায় রান্না করাও হয়নি আজ সকাল-দুপুরে। ঘরে থাকা মুড়ি ও পানি খেয়েই সকাল-দুপুর পার করেছেন।

শওকত আলীর রান্না ঘরে দুই বেলা চুলো জ্বলেনি, খেয়াল করে পাশের বাড়ির চাচাতো পুত্রবধূ রাহেলা। বিকেলে রাহেলা খাবার নিয়ে এসে দেখেন বিছানায় ঘুমিয়ে আছেন শওকত আলী। রাহেলা ডাক দেয়, কাকা উঠেন। আপনি মনে হয় আজ কিছু খাননি। সারা জীবন মাথা উঁচু করে চলা শওকত আলীর চোখ ছলছল করতে থাকে। রাহেলা খাবার রেখে যায় পাশের টেবিলে এবং বলে যায়, আপনাকে আর রান্না করতে হবে না চাচা। আমি খাবার পাঠাবো। আমার বড় ছেলে সোহেল আপনার সঙ্গে থাকবে রাতে। আপনি না করবেন না। শওকত আলী আর না করে না, দিনটা কোনো রকম বাড়িতে ও হাট-বাজারে গিয়ে কেটে গেলেও রাতটা হয়ে যায় কঠিন থেকে কঠিন। তাই রাজি হয়ে যায়।

রাহেলা শওকত আলীর মেয়েকে ফোন করে সব জানায়। মেয়ে আয়েশা স্বামী সন্তানদের নিয়ে বাবার বাড়িতে আসে। বাবাকে নিজেদের সাথে নিয়ে যেতে চায়। রাজী হয় না শওকত আলী।

‘আমি এত দিন একা থেকেছি, বাকি দিনগুলো বাপের ভিটেমাটি ও স্ত্রী সম্তানের কবরের পাশেই থাকতে চাই। তোরা এসেছিস, ভালো লেগেছে। সুযোগ হলে কয়েক দিন থেকে যা।’ কয়েক দিন থাকার সিদ্ধান্ত নেয় আয়েশা। নাতি-নাতনিদের নিয়ে ভালোই সময় কাটে কিছু দিন।

আয়েশার স্বামী আলম মির্জা আয়েশাকে বলেন, বাবা অসুস্থ কখন কী হয়ে যায় বলা যায় না, তুমি বাবাকে বলো সব সম্পত্তি তোমার নামে কিংবা আমাদের দুই সন্তানের নামে লিখে দিতে। না হয় পরে অন্যরা সমস্যা করবে, কারণ তোমার কোনো ভাই নেই।

আয়েশা জানায়, আমি বাবাকে এটা বলতে পারবো না। বাবা খুব কষ্ট পাবে নিজ থেকে বললে। বাবা নিজ থেকে কোনো সিদ্ধান্ত না নিলে আমার বলা ঠিক হবে না।

শওকত আলী সব শুনতে পায়। কী করতে হবে বুঝে যান তিনি। মেয়ে ও মেয়ের জামাইকে নিয়ে রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে দুই নাতি-নাতনির নামে সব লিখে দেয়। তার মধ্যে এলাকার গৃহহীন করিম মিয়াকে পাঁচ শতাংশ ও মসজিদের জন্য পাঁচ শতাংশ জমি দান করেন।

স্ত্রী সন্তানদের কবরের পাশে নিজের কবরের জন্য ঘোষিত জায়গার পাশেই মসজিদের জন্য জায়গা দেওয়া হয়। নিজের নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমানো টাকা থেকে মসজিদ নির্মাণের খরচ দেবে সিদ্ধান্ত নেয়। আয়েশার স্বামী আপত্তি করতে চাইলেও আয়েশা খুশি হয় বাবার সিদ্ধান্তে।

পৈত্রিক ভিটে বাড়ি ও সহায় সম্পত্তি নাতি নাতনিকে দিলেও বাবার নাম মুছে যাচ্ছে ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন শওকত আলী। আবার পরক্ষণেই ভাবেন, বাবার নামে মসজিদ হবে। মসজিদের অর্থায়নে থাকবে আমার নাম। আমার কোনো ছেলে সন্তান না থাকলেও মসজিদের সুবাদে মানুষের মনে আজীবন থাকবে আমাদের নাম। হতাশার মাঝেও তৃপ্তির ঢেকুর তোলেন শওকত আলী।

আয়েশা কয়দিন থেকেই স্বামী সন্তান নিয়ে চলে যায়। বাবাকে নিজের সাথে নিতে চাইলেও রাজি হননি তিনি। নাতি-নাতনিদের নিয়ে ভালোই সময় কাটে এই কয়দিন। ওরা চলে যাবার পর আবার একা হয়ে যায় শওকত আলী। একাকিত্ব গ্রাস করে তাকে। তবে করিমকে জমি দান ও মসজিদ নির্মাণের ঘোষণায় খুশি হয় এলাকাবাসী। এত দিন সবাই বহু দূরের মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়তো। এখন বাড়ির কাছেই সম্ভব হবে।

মসজিদ নির্মাণ কমিটি করে মসজিদের জায়গা ও টাকা বুঝিয়ে দেয় শওকত আলী। করিম মিয়াকেও দানকৃত জায়গা বুঝিয়ে দেয়। শওকত আলীর মনে হয় দুনিয়াবী সব কাজ শেষ হয়েছে তার। আর কিছু বাকি নেই। নিজের বলতেও আর কিছু নেই তার।

আজ সোহেল রাতে আসবে বলেও আসেনি। একা একা ভালো লাগছিল না তার। সোহেল থাকলে ওর সঙ্গে পুরনো গল্প বলতে পারলে ভালো লাগতো। জানালা দিয়ে স্ত্রী সন্তানের কবরের দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকে, তোমাদের কাছে শীঘ্রই আসছি আমি। বেদনার একাকিত্বের ভার আর বইতে পারছি না।

ঘুমাতে চেষ্টা করলেও ঘুম আসছে না শওকত আলীর। জমিলাকে বিয়ে করার সময়কার কথা বারবার মনে পড়ছে। হঠাৎ কাশি ওঠে তার। পানি খেতে চায়, কিন্তু বিছানা থেকে টেবিলে গিয়ে গ্লাস হাতে নেওয়ার আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন শওকত আলী। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময়ের একাকিত্বের অবসান ঘটে শরীরি অবসান দিয়ে।

সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতো শওকত আলী। কিন্তু সকাল ৯টা বেজে গেলেও তাকে বাইরে না দেখে রাহেলার চিন্তা হয়। ঘরের দরজার সামনে এসে ডাকলেও সাড়া না দেওয়ায় কান্নাকাটি করে লোকজন জড়ো করে রাহেলা। দরজা ভেঙ্গে ঘরে ঢুকে দেখে বিছানায় পড়ে আছে শওকত আলীর নিথর দেহ।

মেয়ে আয়েশাকে খবর দিলে বাবার মৃত্যুর সংবাদে ছুটে আসে আয়েশা। আয়েশার কান্না আর বিলাপে ভারী হয়ে যায় শওকত আলীর বাড়ির আকাশ-বাতাস। প্রতিবেশীরাও কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী স্ত্রী-সন্তানদের পাশেই সমাধিস্থ করা হয় শওকত আলীকে।

লেখক: শিক্ষার্থী, ডিপ্লোমা ইন জার্নালিজম, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব জার্নালিজম অ্যান্ড ইলেকট্রনিক মিডিয়া (বিজেম)।

 

বিজেম/হাকিম মাহি



[ad_2]

Source link

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরও সংবাদ

বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস

সর্বমোট

আক্রান্ত
৪৯,৫৩৪
সুস্থ
১০,৫৯৭
মৃত্যু
৬৭২
সূত্র: আইইডিসিআর

সর্বশেষ

আক্রান্ত
২,৩৮১
সুস্থ
৮১৬
মৃত্যু
২২
স্পন্সর: একতা হোস্ট

নামাজের সময় সূচি

  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৩:৪৬ পূর্বাহ্ণ
  • ১১:৫৯ পূর্বাহ্ণ
  • ৪:৩৪ অপরাহ্ণ
  • ৬:৪৫ অপরাহ্ণ
  • ৮:১০ অপরাহ্ণ
  • ৫:০৯ পূর্বাহ্ণ

© All rights reserved © 2020 purbakantho
কারিগরি সহযোগিতায়-SHAHIN প্রয়োজনে:০১৭১৩৫৭৩৫০২ purbakantho
themesba-lates1749691102