রবিবার ২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১১ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

সব মানুষের জীবনমান বাড়লেও ভাগ্যের উন্নয়ন হয়নি আদিবাসীদের

তপু সরকার হারুন,শেরপুর প্রতিনিধি :  |  আপডেট ৫:১২ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ৩১ আগস্ট ২০২১ | প্রিন্ট  | 70

সব মানুষের জীবনমান বাড়লেও ভাগ্যের উন্নয়ন হয়নি আদিবাসীদের

শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার বিস্তীর্ণ পাহাড়ী এলাকাজুড়ে কোচ, গারো ও হাজং সম্প্রদায়ের আদিবাসীরা সুদীর্ঘকাল থেকে বসবাস করে। এই এলাকাটি আবার গারো পাহাড় হিসেবেও খ্যাত। এক সময় এই এলাকার আদিবাসীদের গোলাভরা ধান আর পুকুরভরা মাছ ছিল। তারা বছর জুড়ে সাংস্কৃতিক ভিন্ন ভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করত। এখন কালের আবর্তে আদিবাসীদের নানা সংস্কৃতি, ঐতিহ্য-ইতিহাস বিলুাপ্তর পথে।

সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে, নালিতাবাড়ী উপজেলায় ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে ১১টি ইউনিয়নে ৭৪ টি গ্রামে সহস্রাধিক পরিবারে প্রায় ৫০ হাজার আদিবাসী লোকজন নানা প্রতিকুল পরিবেশ মোকাবেলা করে বাপ-দাদার বসত ভীটায় বসবাস করে আসছেন। এসব সম্প্রদায়ের রয়েছে আলাদা কৃষ্টি সংস্কৃতি ও আলাদা সমাজ ব্যবস্থা। গারোরা খ্রীষ্টান ধর্মাবলম্বী আর কোচ ও হাজং সম্প্রদায়ের লোকজন সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বী।


গারো আদিবাসীরা মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত পরিবার। গারোদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব হলো বড়দিন। এছাড়াও প্রতিবছর ষ্টার সানডে, তীর্থ উৎসব, ইংরেজী নববর্ষ পালন ও নতুন ফসল গোলায় তুলার আগে ওয়ানগালা উৎসব পালন করে থাকে। কোচদের বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব হলো দুর্গাপুজা ও কালিপুজা উৎসব। এসব ধর্মীয় উৎসব ছাড়াও আদিবাসীরা অলাদা আলাদা সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান পালন করে থাকেন। কালের বিবর্তনে বর্তমান ডিজিটাল যুগে এসব গারো, হাজং ও কোচ আদিবাসীদের হাজার বছরের ঐতিহ্য-সংস্কৃতি এখন হাড়িয়ে যেতে বসেছে। তাই তাদের ঐতিহ্য সংস্কৃতি রক্ষায় সরকারি-বেসরকারিভাবে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন বলে কোচ আদিবাসী নেতা বনকুড়া এলাকার সুমন্ত বর্মন বলেন ( ৫০) জানান।

নালিতাবাড়ী উপজেলার সীমান্তবর্তী পানিহাটা, তাড়ানি, পেকামাড়ি, মায়াঘাসি, নাকুগাঁও, দাওধারা, আন্ধারুপাড়া, খলচান্দা, বুরুঙ্গা, বাতকুচি, সমেশ্চুড়া, খলিসাকুড়ি, গাছগড়া, নয়াবিল এলাকায় কোচ ও গারো আদিবাসীদের বসবাস। অনাদিকাল থেকেই এসব এলাকায় বাপ-দাদার বসত ভিটায় আদিবাসীরা বসবাস করে আসছে। চলমান পৃথিবীতে বিশ্বের সব মানুষের জীবনমান বাড়লেও আবিাসীদের ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটেনি। বরং তাদের হজার বছরের ইতিহাস ঐতিহ্য হাড়িয়ে যেতে বসেছে।

আদিবাসী নেতা মি. নবেশ খিশ্সি বলেন, বর্তমান ডিজিটাল যুগে আদিবাসীদের কৃষ্টি-সংস্কৃতি এখন হাড়িয়ে যেতে বসেছে। হারিয়ে যাওয়া বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে আছে (আদিবাসীদের ভাষায়) মান্দিদামা, ক্রাম, খোল, নাগ্রা, জিপসি, খক, মিল্লাম, স্ফি, রাং, বাঁশের বাশি, আদুরী নামের বাদ্যযন্ত্র ও পোশাক দকবান্দা, দকশাড়ী, খকাশিল, দমী, রিক মাচুল আর কোচ আদিবাসীদের রাংঙ্গা লেফেন ও আছাম হাড়িয়ে যেতে বসেছে। আর খাদ্যের তালিকায় রয়েছে বাঁশের কড়–ল আর চালের গুড়া দিয়ে তৈরি খাবার উপকরন ‘মিয়া’, কলাপাতায় করে ছোট মাছ আগুনে পুড়া দিয়ে খাওয়া যার নাম ‘ইথিবা’, মুরগির বাচ্চা পুড়া দিয়ে বাঁশের চোঙ্গায় ভরে পেয়াজ ও কাচা মরিচ দিয়ে ভর্তা করে খাওয়া যার নাম ব্রেংআ, মিমিল, কাকড়া, শামুক ও শুকরের গোস্ত, চালের তৈরি মদ যার নাম চু আর কোচ আদিবাসীদের কাঠমুড়ি ইত্যাদি খাবার উপকরন প্রায় বিলুপ্ত হতে চলেছে।

সীমান্তঘেষা খলচান্দা গ্রামের কোচ আদিবাসী দষিন্দ্র কোচ (৪০) বলেন, এখানে কোচ সম্প্রদায়ের এক সময় ৫০টি পরিবারের বেশী বসবাস করতো । বর্তমানে ২০/২৫ টি পরিবার বসবাস করে ।এ গ্রামের নারী ও পুরুষেরা কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। এ ছাড়া পাহাড় থেকে লাকড়ি সংগ্রহ ও বাঁশ দিয়ে ঢোল তৈরি করে তাঁরা সংসার চালান। অধিকাংশ বাড়িতে কাঁচা পায়খানা। এ গ্রামে বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) পরিচালিত তৃতীয়শ্রেণি পর্যন্ত একটি বিদ্যালয় ছাড়া নেই কোনো সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

পাড়ার শিশুরা সাধারণত পড়ালেখা করে না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বড়দের সঙ্গে চাষাবাদের কাজে জড়িয়ে পড়ে। সারা গ্রামে কয়েকটি নলকূপ থাকলেও বছরের বেশির ভাগ সময় নষ্ট থাকে। তাই মাটির কূপ ও নদীর পানিই তাদের ভরসা। কোনো রোগ হলে তাদের ছুটে যেতে হয় সাড়ে তিন কিলোমিটার পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে মিশনারি হাসপাতালে। সেখানে না যেতে পারলে ২০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে যেতে হয় উপজেলা সদরে। গ্রামটিতে কোনো পাকা সড়ক নেই। শুষ্ক মৌসুমে কাঁচা সড়কে চলাফেরা করতে পারলেও বর্ষায় চলাচলে সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে পড়ে।

পোড়াঁগাও ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি বন্ধনা চাম্বুগং বলেন আমরা বন-পাহাড়ে যুদ্ধ করে অসহায় জীবন যাপন করে আসছি। তাই পেটের তাগিদে ইতিহাস ঐতিহ্য বুঝিনা শুধু এটাই বুঝি বেঁচে থাকতে হবে। নিজস্ব ভাষায় কথা বলার জন্য কোচদের আছে কোচ ভাষা আর গারোদের আছে আচিক ভাষা। বর্তমানে এই দুই ভাষাতেও বাংলা ভাষার সংমিশ্রন হয়ে গেছে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই তাদের নিজস্ব ভাষার ফাঁকে ফাঁকে বাংলা জুড়ে দিয়ে কথা বলেন।

নিজস্ব ভাষা সংরক্ষনের তথা মায়ের ভাষায় কথা বলার জন্য কোচ আদিবাসীদের নিজস্ব ভাষায় স্কুল প্রতিষ্ঠার দাবিও জানান খলচান্দা গ্রামের শিক্ষক শ্রী পরিমল কোচ (৩৬)। ওই গ্রামের মন্ডল (মাতব্বর) শ্রী শবরন্ত কোচ (৭৫) বলেন, যুগের সাথে আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতি অনেকটাই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এগুলো সংরক্ষনের ব্যবস্থা করা দরকার।

আদিবাসী সংগঠন ট্রাইভাল ওয়েল ফেয়ার এসোসিয়েশনের (টিডাব্লিউএ) সাবেক চেয়ারম্যান মি. লুইস নেংমিনজা জানান, আদিবাসীদের কৃষ্টি-সংস্কৃতি সংরক্ষনে নালিতাবাড়ীতে আমরা কালচারাল একাডেমি স্থাপনের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি। যা আদিবাসীদের বিলুপ্ত হতে চলা বিভিন্ন উপকরন স্মৃতি স্বরুপ যুগযুগ ধরে সংরক্ষিত থাকবে।

উল্লেখ্য, ৩শ ২৭ দশমিক ৬১ বর্গকিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলায় ১টি পৌরসভা, ১২টি ইউনিয়ন, ৩টি খ্রিষ্টান মিশন, ২টি আদিবাসী কমিউনিটি সেন্টার ও ১শ ৯৯টি গ্রামে ২ লাখ ৫১হাজার ৮শ ২০ জন লোকের বসবাস।

শেয়ার করুন..

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement
এক ক্লিকে বিভাগের খবর

এ বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০  
ঘোষনা : আমাদের পূর্বকন্ঠ ওয়েবসাইটে প্রবেশ করার জন্য আপনাকে স্বাগতম। আপনার আশপাশে ঘটে যাওয়া খবরা খবর জানাতে আমাদের ফোন করুন-০১৭১৩৫৭৩৫০২ এই নাম্বারে ☎ গুরুত্বপূর্ণ নাম্বার সমূহ : ☎ জরুরী সেবা : ৯৯৯ ☎ নেত্রকোনা ফায়ার স্টেশন: ০১৭৮৯৭৪৪২১২☎ জেলা প্রশাসক ,নেত্রকোনা:০১৩১৮-২৫১৪০১ ☎ পুলিশ সুপার,নেত্রকোনা: ০১৩২০১০৪১০০☎ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, সদর সার্কেল : ০১৩২০১০৪১৪৫ ☎ ইউএনও,পূর্বধলা : ০১৭৯৩৭৬২১০৮☎ ওসি পূর্বধলা : ০১৩২০১০৪৩১৫ ☎ শ্যামগঞ্জ পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র : ০১৩২০১০৪৩৩৩ ☎ ওসি শ্যামগঞ্জ হাইওয়ে থানা : ০১৩২০১৮২৮২৬ ☎ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা, পূর্বধলা: ০১৭০০৭১৭২১২/০৯৫৩২৫৬১০৬ ☎ উপজেলা সমাজসেবা অফিসার, পূর্বধলা : ০১৭১৮৩৮৭৫৮৭/০১৭০৮৪১৫০২২ ☎ উপজেলা মৎস্য অফিসার, পূর্বধলা : ০১৫১৫-৬১৪৯২১ ☎ উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা, পূর্বধলা : ০১৯৯০-৭০৩০২০ ☎ উপজেলা প্রাণি সম্পদ অফিসার, পূর্বধলা : ০১৭১৮-৭২৮২৯৪ ☎ উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) পূর্বধলা :০১৭০৮-১৬১৪৫৭ ☎ উপজেলা আনসার ভিডিপি অফিসার, পূর্বধলা : ০১৯১৪-৯১৯৯৩৮ ☎ উপ-সহকারি প্রকৌশলী, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিস, পূর্বধলা : ০১৯১৬-৮২৬৬৬৮ ☎ উপজেলা যুব উন্নয়ন অফিসার, পূর্বধলা : ০১৭১১-৭৮৯৭৯৮ ☎ উপজেলা কৃষি অফিসার, পূর্বধলা : ০১৭১৬-৭৯৮৯৪৬ ☎ উপজেলা শিক্ষা অফিসার, পূর্বধলা : ০১৭১৫-৪৭৪২৯৬ ☎ উপজেলা সমবায় অফিসার, পূর্বধলা : ০১৭১৭-০৪৩৬৩৯ ☎ সম্পাদক পূর্বকন্ঠ ☎ ০১৭১৩৫৭৩৫০২ ☎
মোঃ শফিকুল আলম শাহীন সম্পাদক ও প্রকাশক
পূর্বকণ্ঠ ২০১৬ সালে তথ্য অধিদপ্তরে নিবন্ধনের জন্য আবেদিত।
বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয়

স্টেশন রোড, পূর্বধলা, নেত্রকোনা।

হেল্প লাইনঃ +৮৮০৯৬৯৬৭৭৩৫০২

E-mail: info@purbakantho.com