মঙ্গলবার ২৬শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১০ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

শেরপুরে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্নগুলো যেন দেখার কেউ নেই

 |  আপডেট ১১:০২ অপরাহ্ণ | রবিবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২০ | প্রিন্ট  | 131

শেরপুরে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্নগুলো যেন দেখার কেউ নেই

মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দেশজুড়ে চালিয়েছে বীভৎস হত্যাযজ্ঞ। পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের হাতে প্রাণ দিয়েছেন শেরপুরের অসংখ্য নারী-পুরুষ। গণহত্যার পর কোথাও মাটিচাপা দিয়ে রাখা হয়েছে, কোথাও লাশ ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে নদীতে। আবার কোথাও হত্যাযজ্ঞের পর স্থানীয় লোকজন লাশগুলোর সৎকার করেছেন। কিন্তু দেশ স্বাধীনের পর এইসব বধ্যভূমি ও গণকবরগুলো সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও উদ্যোগ নেয়া হয়নি যুদ্ধদিনের নিরব স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলোর। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের প্রগতিশীল আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী স্থান, গণকবর ও বধ্যভূমিগুলো সরকারিভাবে সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন।



মুক্তিযুদ্ধকালীন শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার আহমদ নগর উচ্চ বিদ্যালয়ে শক্তিশালী ঘাঁটি স্থাপন করে হানাদার বাহিনী। এটি ছিল পাক হানাদার বাহিনীর আঞ্চলিক হেডকোয়ার্টার। পাকবাহিনী এবং তাদের দোসররা আহমদ নগর উচ্চ বিদ্যালয়কে নির্যাতন কেন্দ্র ও বধ্যভূমি হিসেবে ব্যবহার করে। ৭১ সারে ৯ মাসই এখানে চলে তাদের নৃশংসতা। পাকিস্তানি পশুরা নারী-পুরুষের ওপর অমানুষিক অত্যাচার চালানোর পর তাদের বগাডুবি ব্রিজে নিয়ে অথবা কোয়ারি রোড, জুলগাঁওয়ে হত্যার পর এসব লাশ মাটিচাপা দিয়ে অথবা নদীতে ভাসিয়ে দিত।


স্বাধীনতার পর আহমদ নগর স্কুল ও তার আশপাশ এলাকায় অসংখ্য কঙ্কাল পাওয়া যায়। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ঘাগড়া কোনাপাড়া বধ্যভূমির পাশে এলজিইডির অর্থায়নে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হলেও তা অসম্পূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। স্মৃতিস্তম্ভটি রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তা এখন গো-চারণ ভূমিতে পরিণত হয়েছে।

ঝিনাইগাতী উপজেলার জগৎপুর গ্রামে ১৯৭১ সনের ৩০ এপ্রিল গণহত্যা চালানো হয়। এদিন এই গ্রামের ৪২ জন হিন্দু পরিবারের সদস্যসহ মোট ৫৮ জন নারী-পুরুষকে হত্যা করা হয়। পুড়ে ছারখার করে দেয়া হয় বাড়িঘর।

১৯৭১ সালের ২৫ মে নালিতাবাড়ী উপজেলার নাকুগাঁও সীমান্তের ভোগাই নদী পার হয়ে পাকহানাদার বাহিনী ভারতের বারাঙ্গাপাড়া থানার ডালুতে গণহত্যা চালায়। এ সময় বাংলাদেশ থেকে ডালুতে আশ্রয় নেয়া মুক্তিকামী মানুষ ও ভারতীয় নাগরিকসহ দুই শতাধিক নারী-পুরুষ নিহত হয়। পাক হানাদারদের প্রতিরোধ করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করে ৯জন বিএসএফ সদস্য।



ভারতের কাটাতার ঘেঁষা এই নাকুগাঁওয়ে গণহত্যার শিকার বাংলাদেশি মুসলমানদের লাশ দাফন করা হয়। এছাড়াও ৯ মাসে এ স্থানে বিভিন্ন যুদ্ধে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের কবর দেয়া হয়। স্বাধীনতার পর ভারত সরকার তাদের বিএসএফ সদস্যদের স্মরণে একটি স্মৃতিফলক নির্মাণ করে। গত বছর এটি আরও বৃহৎ আকারে সংস্কার করে স্মৃতিস্তম্ভটি পুনর্নির্মাণ করে ভারত সরকার। কিন্তু নালিতাবাড়ীর নাকুগাঁওয়ের গণকবরটি এখনও অবহেলায় পড়ে আছে। ১৯৯৭ সালে এলজিইডির তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী নাকুগাঁও গণকবরটি এলজিইডির মাধ্যমে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন। কিন্ত আজ পর্যন্ত তা আলোর মুখ দেখেনি।

নালিতাবাড়ী উপজেলার রামচন্দ্রকুড়া-মন্ডালিয়াপাড়া ইউনিয়নের তন্তর গ্রামটি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের অস্থায়ী ঘাঁটি। ১৯৭১ সালের ৩০ জুন পাকহানাদার বাহিনী আলবদর-রাজাকারদের নিয়ে ওই গ্রামে হামলা চালায়। এসময় তিনজন বীর মুক্তিযোদ্ধা সহ মোট ৭ জন শহীদ হন।

কাঁটাখালি ব্রিজ এবং রাঙ্গামাটি খাটুয়ামাড়ি গ্রাম :
শেরপুর-ঝিনাইগাতী-নালিতাবাড়ী সড়কের কাঁটাখালি ব্রিজ। এ ব্রিজটিই ছিল তখন সীমান্ত যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। তাই পাকহানাদারদের সীমান্ত এলাকায় অবাধ যাতায়াত বন্ধ করতে এ ব্রিজটি ভাঙ্গার সিদ্ধান্ত নেয় মুক্তিযোদ্ধারা। কিন্তু পর পর দু’বার অপারেশন করেও সফল না হওয়ার পর এ ব্রিজ অপারেশনে আসেন ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি প্রকৌশল অনুষদের শেষ বর্ষের ছাত্র নাজমুল আহসান। ১৯৭১ সালের ৫ জুলাই রাতে তিনি তার ৫৩জন সহযোদ্ধাদের নিয়ে কাঁটাখালি ব্রিজ এবং তিনানি ফেরি ধ্বংসের সফল অপারেশন শেষে ঝিনাইগাতীর রাঙামাটি-খাটুয়ামারি গ্রামে আশ্রয় নেন।

পরদিন ৬ জুলাই এ গ্রামের দালাল জালাল মিস্ত্রির সহযোগিতায় পাকসেনারা তিনদিক পানিবেষ্টিত গ্রামটিতে হামলা চালায়। এ সময় সন্মুখ যুদ্ধে কোম্পানি কমান্ডার নাজমুল আহসান, তার চাচাতো ভাই মোফাজ্জল হোসেন, ভাইপো আলী হোসেন শহীদ হন। আহত হন বেশ ক’জন। এছাড়াও মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেয়ার অপরাধে ৯ জন গ্রামবাসীকে নৃশংসভাবে হত্যা ও ৬ জন নারীকে ধর্ষণ করা হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধে অপরিমেয় ত্যাগ স্বীকার করা এ গ্রামটির কথা কেউ মনে রাখেনি। স্বীকৃতি মেলেনি শহীদ পরিবার এবং বীরাঙ্গনাদের।



নালিতাবাড়ী উপজেলার কাকরকান্দি ইউনিয়নের সোহাগপুর গ্রাম। ১৯৭১ সালের ২৫ জুলাই পাকহানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসররা তাণ্ডব চালিয়ে ওই গ্রামের ১৮৭ জন পুরুষকে হত্যা করে। স্বাধীনতার পর গ্রামটি প্রথমে বিধবাপাড়া ও পরে ১ বিধবাপল্লী’ হিসেবে দেশ-বিদেশে পরিচিতি লাভ করে। এ গ্রামে এখনো রয়েছে ৫৯টি গণকবর। এ গণহত্যার জন্যই জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের ফাঁসি হয়েছে।

আলোচিত এই গ্রামটিকে এক নজর দেখার জন্য প্রায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ আসে। কিন্তু এসে হতাশ হন। কারণ এখানে সেই ভয়াবহ গণহত্যার স্মৃতি মনে রাখার মতো কিছুই। অন্যের জমিতে রয়েছে একটি স্মৃতিফলক আর বসার জন্য একটি ঘর। অথচ মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ধরে রাখতে এখানে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি জাদুঘরসহ নানা কিছু করা যেতে পারে। এজন্য শহীদ পরিবারের সদস্যরা জমি দিতেও ইচ্ছুক। কিন্তু উদ্যোগ নেই। তাই হারাতে বসেছে সোহাগপুর বিধবা পল্লীর সেই রক্তস্নাত ইতিহাস।

শেয়ার করুন..

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এক ক্লিকে বিভাগের খবর

এ বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০৩১  
ঘোষনা : আমাদের পূর্বকন্ঠ ওয়েবসাইটে প্রবেশ করার জন্য আপনাকে স্বাগতম। আপনার আশপাশে ঘটে যাওয়া খবরা খবর জানাতে আমাদের ফোন করুন-০১৭১৩৫৭৩৫০২ এই নাম্বারে ☎ গুরুত্বপূর্ণ নাম্বার সমূহ : ☎ জরুরী সেবা : ৯৯৯ ☎ নেত্রকোনা ফায়ার স্টেশন: ০১৭৮৯৭৪৪২১২☎ জেলা প্রশাসক ,নেত্রকোনা:০১৩১৮-২৫১৪০১ ☎ পুলিশ সুপার,নেত্রকোনা: ০১৩২০১০৪১০০☎ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, সদর সার্কেল : ০১৩২০১০৪১৪৫ ☎ ইউএনও,পূর্বধলা : ০১৭৯৩৭৬২১০৮☎ ওসি পূর্বধলা : ০১৩২০১০৪৩১৫ ☎ শ্যামগঞ্জ পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র : ০১৩২০১০৪৩৩৩ ☎ ওসি শ্যামগঞ্জ হাইওয়ে থানা : ০১৩২০১৮২৮২৬ ☎ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা, পূর্বধলা: ০১৭০০৭১৭২১২/০৯৫৩২৫৬১০৬ ☎ উপজেলা সমাজসেবা অফিসার, পূর্বধলা : ০১৭১৮৩৮৭৫৮৭/০১৭০৮৪১৫০২২ ☎ উপজেলা মৎস্য অফিসার, পূর্বধলা : ০১৫১৫-৬১৪৯২১ ☎ উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা, পূর্বধলা : ০১৯৯০-৭০৩০২০ ☎ উপজেলা প্রাণি সম্পদ অফিসার, পূর্বধলা : ০১৭১৮-৭২৮২৯৪ ☎ উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) পূর্বধলা :০১৭০৮-১৬১৪৫৭ ☎ উপজেলা আনসার ভিডিপি অফিসার, পূর্বধলা : ০১৯১৪-৯১৯৯৩৮ ☎ উপ-সহকারি প্রকৌশলী, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিস, পূর্বধলা : ০১৯১৬-৮২৬৬৬৮ ☎ উপজেলা যুব উন্নয়ন অফিসার, পূর্বধলা : ০১৭১১-৭৮৯৭৯৮ ☎ উপজেলা কৃষি অফিসার, পূর্বধলা : ০১৭১৬-৭৯৮৯৪৬ ☎ উপজেলা শিক্ষা অফিসার, পূর্বধলা : ০১৭১৫-৪৭৪২৯৬ ☎ উপজেলা সমবায় অফিসার, পূর্বধলা : ০১৭১৭-০৪৩৬৩৯ ☎ সম্পাদক পূর্বকন্ঠ ☎ ০১৭১৩৫৭৩৫০২ ☎
মোঃ শফিকুল আলম শাহীন সম্পাদক ও প্রকাশক
পূর্বকণ্ঠ ২০১৬ সালে তথ্য অধিদপ্তরে নিবন্ধনের জন্য আবেদিত।
বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয়

স্টেশন রোড, পূর্বধলা, নেত্রকোনা।

হেল্প লাইনঃ +৮৮০৯৬৯৬৭৭৩৫০২

E-mail: info@purbakantho.com