মঙ্গলবার ১৯শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশকে পড়তে হলে গুণের কবিতা পড়তেই হবে

ফকির ইলিয়াস :  |  আপডেট ৮:৩৮ অপরাহ্ণ | বুধবার, ০৬ মে ২০২০ | প্রিন্ট  | 249

বাংলাদেশকে পড়তে হলে গুণের কবিতা পড়তেই হবে

[ad_1]

কবি নির্মলেন্দু গুণ বলেছেন, ‘হ্যাঁ, আমি আওয়ামী লীগের কবি’।  তাঁর এই কথাটি নিয়ে বেশ বিতর্ক হচ্ছে। কেন তিনি আওয়ামী লীগের কবি, তার ব্যাখ্যাও তিনি দিয়েছেন। তারপরও একটি ‘সুশীল’, তথাকথিত ‘নিরপেক্ষ’ এবং ‘গণমানুষের পক্ষের’ ব্যক্তিরা গুণের বিরুদ্ধে নানা রকম খিস্তি-খেউড় আওড়াচ্ছেন।


তাদের অভিযোগ, এ কথা বলার মাধ্যমে গুণ ‘কবি’ থেকে খারিজ হয়ে গিয়েছেন। কেউ কেউ গুণের পিঠে হাত দিয়ে তাঁর ‘মেরুদণ্ড’ খোঁজারও চেষ্টা চালাচ্ছেন! আচ্ছা, এই বয়সে এসে বারবার বাহু ও মেরুদণ্ড দুটো দেখানোর পরও কি নির্মলেন্দু গুণকে তাঁর পাঞ্জাবি খুলে পিঠ দেখাতে হবে! কবিতায় জাতির পিতা হত্যার তীব্র প্রতিবাদ করে, গুণ স্বৈরাচারী সামরিক খুনীদের কি তাঁর বাহু দেখান নি? দেখিয়েছিলেন। আপনারা কি তা পড়েন নি? নাকি অন্ধ সেজেছেন আজকাল! তাঁর মেরুদণ্ড তো বাংলাদেশ, বাংলা ভাষা, বাংলা কবিতায় পরীক্ষিত। আবারও পরীক্ষা দিতে হবে তাঁকে?

আমি একাত্তর দেখা মানুষ। সেই একাত্তরে পাক হায়েনারা গণমানুষের লুঙ্গি খুলে দেখতো ওরা হিন্দু না মুসলমান! আজ যারা গুণের ‘মেরুদণ্ড’ দেখতে চান, ওদের আমার কাছে ওই পাক হায়েনাদের উত্তরসূরী বলেই মনে হয়। এই ২০২০ সালে এসেও লুঙ্গি উল্টিয়ে আমাদের দেখাতে হবে? গুণ সহনশীল মানুষ। তিনি এই প্রশ্নটি ওদের করেন নি। চাইলে করতে পারতেন।

আর যারা গুণকে খুঁদ-কুঁড়ার লোভী বলে মনে করেন, তারা আসলে প্রকৃত গুণকে চেনেন না। গুণ অর্থ-বিত্তের লোভ কখনও করেন নি। নির্মলেন্দু গুণ বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান ১৯৮২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। এই সময়ে বিচারপতি আব্দুস সাত্তার, রাষ্ট্র ক্ষমতায়। কেউ কেউ বলেছেন, গুণ নাকি স্বৈরাচারী এরশাদের সময় বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছিলেন। এটা একটা ডাহা মিথ্যা কথা। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ প্রত্যুষে বাংলাদেশে সামরিক আইন জারি করে জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ একটি রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে সরিয়ে দেশের কর্তৃত্ব নেন। এরা কতটা মিথ্যুক হলে এমন বানোয়াট কথা বলতে পারে!

স্বৈরাচারী এরশাদের সময়ে বাংলাদেশে একটি ‘রাজকবি সভা’ গঠিত হয়েছিল। আল মাহমুদ, ফজল শাহাবুদ্দীন, মোশাররফ করিম, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ প্রমুখ এই এরশাদীয় কবিসভার পদ গুলজার করেছিলেন। সবই আমাদের দেখা। আমরা সবকিছুরই সাক্ষী। ওই সময়ে ‘এক টাকা নামমাত্র মূল্যে’

যারা ঢাকার অভিজাত এলাকায় প্লট/বাড়ি নিয়েছিলেন; গুণ যদি লোভী হতেন এমন কিছু নিতে পারতেন না? অবশ্যই পারতেন।

তা না করে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন ‘জাতীয় কবিতা পরিষদ’-এর। শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, রফিক আজাদ, বেলাল চৌধুরী, মোহন রায়হান প্রমুখ কবিদের সঙ্গে নিয়ে গুণ ছিলেন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে। ছিলেন না? এসব ভুলে গেছেন আজকের এই ‘সুশীল’রা?

না। একজন কবি কিংবা লেখক কোনো দলের হলেই তিন অন্ধ হয়ে যান না। মনে রাখতে হবে, স্থানিক-কালিক-ভাষিক বিবেচনায়ই কবি নির্ধারণ করেন তার অবস্থান। ইউরোপ আমেরিকায় লাখ লাখ মানুষের সমাগম ঘটিয়ে পলিটিক্যাল জনসভা হয় না। বাংলাদেশে হয়। তাই বাংলাদেশ আর পাশ্চাত্যের অবস্থান বিবেচনা এক নয়। পাশ্চাত্যে কবিরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কবিতা বিষয়ে লেকচার দিয়ে লাখ লাখ ডলার সম্মানী পান। বাংলাদেশে তেমন প্রথা চালু করা গিয়েছে কি? বাংলাদেশ কি ‘পোয়েট লরিয়েট’-এর সম্মান দেয় রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায়? না দেয় না। তাই পাশ্চাত্যের সাথে বাংলাদেশের তুলনা কেন করা হবে এই প্রেক্ষাপটে?

গুণ একুশে পদক পেয়েছেন। তিনি স্বাধীনতা পদকও পেয়েছেন। হ্যাঁ, তিনি স্বাধীনতা পদক পাওয়ার জন্য নিজেই সুপারিশ করেছিলেন। একজন নাগরিক তার যোগ্য এবং নমস্য কর্মকাণ্ড নিয়ে রাষ্ট্রের কাছে সুপারিশ করতেই পারে। কেন পারবে না? বিশ্বে এমন অনেক উদাহরণ আছে। গুণ স্বাধীনতা পদক দাবি করার পর, একটি দল তাঁর উপর হামলে পড়তে চেয়েছিল। পড়েওছিল। কেন পড়েছিল? এরা কারা? এরা তারাই, যারা ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’- কবিতাটি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে না। তারা এই কবিতাটিকে হিংসা করে অথবা সহ্য করতে পারে না। তাহলে মূলত এরা কারা? কী তাদের পরিচয়? না। এদের পরিচয় আজ নতুন করে দেওয়ার দরকার নেই।

নির্মলেন্দু গুণ, আওয়ামী লীগের মন্দ কাজের সমালোচনা করেন না- যারা একথা বলেন তারা গুণের কাজকে জানেন না ভালোভাবে। অথবা এড়িয়ে গিয়ে একচক্ষু হতে চান। গুণ সবসময়ই গণমানুষের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে বিভিন্ন সময়েই আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনা করেছেন। তাজ্জবের সাথে লক্ষ্য করি- সমালোচকরা এসব দেখেন না।

গুণ লিখেছেন: ‘১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু যখন বাঙালির বাঁচার দাবি ৬ দফা ঘোষণা করলেন, তারপর থেকে আমি বঙ্গবন্ধু ও তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পক্ষে গণজাগরণ সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়েই কবিতা লিখিতে শুরু করেছিলাম। ১৯৬৬-২০২০, মানে গত ৫৪ বছর ধরে আমার কবিতা ও গদ্য রচনায় ঐ মূল-ধারাটিই অদ্যাবধি অব্যাহত রয়েছে।’

গুণের এর পরের সব লেখালেখিই তো আমাদের জানা, পড়া। তাহলে তাঁকে গণমানুষের প্রতিনিধি থেকে খারিজ করা যাবে কীভাবে? নির্মলেন্দু গুণ বাঙালী জাতীয়তাবাদের যে বাংলাদেশ- সেই রাষ্ট্রের আপামর মানুষের কবি। এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। মহান একুশে এলে মহামহিম আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী প্রণীত ‘আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’- গানটি গেয়ে সবাইকেই প্রভাত ফেরি করতে হয়। শহিদ মিনারে যেতে হয়। (যারা শহিদ স্মৃতিতে বিশ্বাস করে না, তাদের খারিজ করেই আমি বলছি)। এই গানটি বাঙালী জাতিসত্তার সাথে মিশে গিয়েছে। আর চাইলেও কাটাকুটি করা যাবে না। যারা ব্যক্তি আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীকে ভালো চোখে দেখেন না গানটি কিন্তু তাদেরও গাইতে হয়! হয় না?

ঠিক একইভাবে কবি নির্মলেন্দু গুণের কিছু কবিতা, কিছু গদ্য, কিছু স্মৃতিকথা বাংলা ভাষা ও সাহিত্য থেকে মুছে ফেলা যাবে না। ফেলার কোনও উপায়ও নেই। এটা তাঁর সমালোচকরা মানুন কিংবা না মানুন!

হ্যাঁ, নির্মলেন্দু গুণ বাংলাদেশের সম্পদ। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সম্পদ। বাংলা কবিতা পাঠকের সম্পদ। বাংলা ভূমিসূত্রের সম্পদ। সেই হিসেবে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দানকারী দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগেরও সম্পদ। একাত্তরের পরাজিত শক্তির আওলাদেরা তা অস্বীকার করতেই পারে। এতে বাংলাদেশের, বাংলা ভাষার কোটি কোটি পাঠকের কিচ্ছুই যায়-আসে না। সমীকরণটা খুব সহজ। কারণ বাংলাদেশকে পড়তে হলে নির্মলেন্দু গুণের কবিতা তাদের পড়তেই হবে। না পড়ে কোনো উপায় তাদের নেই।

এখানে আরেকটি বিষয় বলতে চাই। কেউ কেউ বলতে চাইছেন, নির্মলেন্দু গুণ বিশ্বসাহিত্যে কী করেছেন! আমি তাদের একটি প্রশ্ন করতে চাই। ‘বিশ্বসাহিত্য’ বস্তুটি কী? কী রং তার? কী সংজ্ঞা তার? ইংরেজিতে লিখলেই তা ‘বিশ্বসাহিত্য’ হয়ে গেল? বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড ঘুরে আমি এমন কোনো সাক্ষ্য পাইনি। আপনারা জাতিসংঘের কথা জানেন। এই জাতিসংঘটি মূলত জাতিপুঞ্জ। এখানে সকল ভাষা, গোত্র, সমাজ, বর্ণ, দেশ, কৃষ্টি, সভ্যতার সমাহার। হ্যাঁ, অর্থনীতি- অর্থের বল বিশ্বে অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রণ করে। এর অর্থ এই নয়, বাংলা সাহিত্য ও ভাষা বিশ্বসাহিত্যের বাইরে। বাংলা কবিতার কোটি কোটি পাঠক-পাঠিকা আছেন। এরা কি বিশ্ব থেকে আলাদা? তাহলে তো বাংলা কবিতাও বিশ্বসাহিত্যেরই অংশ। নয় কি?

নির্মলেন্দু গুণ তাঁর কাজ করে যাচ্ছেন। বাকীটা এগিয়ে নেওয়া তাঁর কাজ নয়। অনুবাদের মাধ্যমে বাংলা কবিতা বিশ্বের অনেক প্লাটফর্মে পৌঁছে দেওয়া যায়। কী ভাবে যায় বা যাবে, তা অন্য কোনো নিবন্ধে লিখব। এই নিবন্ধে নয়।

নির্মলেন্দু গুণ নিজেই লিখেছেন: ‘আমার কাছ থেকে নিরপেক্ষ অবস্থান যারা আশা করে, তারা মতলববাজ। আমাকে আওয়ামী লীগের কবি বলে যারা খুশি হতে চান, আমাকে কোণঠাসা করা গেলো বা যাবে বলে ভাবেন- তাদের স্বপ্বভঙ্গ করার জন্য আমি না থাকলেও, আমার বহু-বহু কবিতাই বেঁচে থাকবে।’

হ্যাঁ, তাঁর কবিতা অবশ্যই বেঁচে থাকবে কোটি পাঠকের মাঝে। না থেকে উপায় নেই। গুণ ভাগ্যবান কবি, নিজের জীবদ্দশায় তা দেখে যেতে পারছেন। যা বাংলা ভাষার অনেক কবিই পারেন নি। পারেন নি জীবনানন্দ দাশ! পারলে বাংলা কবিতার গৌরব আরও বাড়তো।

নিউইয়র্ক, ৩ মে ২০২০

ঢাকা/তারা

[ad_2]

Source link

শেয়ার করুন..

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement
এক ক্লিকে বিভাগের খবর

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০৩১  
ঘোষনা : আমাদের পূর্বকন্ঠ ওয়েবসাইটে প্রবেশ করার জন্য আপনাকে স্বাগতম। আপনার আশপাশে ঘটে যাওয়া খবরা খবর জানাতে আমাদের ফোন করুন-০১৭১৩৫৭৩৫০২ এই নাম্বারে ☎ গুরুত্বপূর্ণ নাম্বার সমূহ : ☎ জরুরী সেবা : ৯৯৯ ☎ নেত্রকোনা ফায়ার স্টেশন: ০১৭৮৯৭৪৪২১২☎ জেলা প্রশাসক ,নেত্রকোনা:০১৩১৮-২৫১৪০১ ☎ পুলিশ সুপার,নেত্রকোনা: ০১৩২০১০৪১০০☎ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, সদর সার্কেল : ০১৩২০১০৪১৪৫ ☎ ইউএনও,পূর্বধলা : ০১৭৯৩৭৬২১০৮☎ ওসি পূর্বধলা : ০১৩২০১০৪৩১৫ ☎ শ্যামগঞ্জ পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র : ০১৩২০১০৪৩৩৩ ☎ ওসি শ্যামগঞ্জ হাইওয়ে থানা : ০১৩২০১৮২৮২৬ ☎ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা, পূর্বধলা: ০১৭০০৭১৭২১২/০৯৫৩২৫৬১০৬ ☎ উপজেলা সমাজসেবা অফিসার, পূর্বধলা : ০১৭১৮৩৮৭৫৮৭/০১৭০৮৪১৫০২২ ☎ উপজেলা মৎস্য অফিসার, পূর্বধলা : ০১৫১৫-৬১৪৯২১ ☎ উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা, পূর্বধলা : ০১৯৯০-৭০৩০২০ ☎ উপজেলা প্রাণি সম্পদ অফিসার, পূর্বধলা : ০১৭১৮-৭২৮২৯৪ ☎ উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) পূর্বধলা :০১৭০৮-১৬১৪৫৭ ☎ উপজেলা আনসার ভিডিপি অফিসার, পূর্বধলা : ০১৯১৪-৯১৯৯৩৮ ☎ উপ-সহকারি প্রকৌশলী, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিস, পূর্বধলা : ০১৯১৬-৮২৬৬৬৮ ☎ উপজেলা যুব উন্নয়ন অফিসার, পূর্বধলা : ০১৭১১-৭৮৯৭৯৮ ☎ উপজেলা কৃষি অফিসার, পূর্বধলা : ০১৭১৬-৭৯৮৯৪৬ ☎ উপজেলা শিক্ষা অফিসার, পূর্বধলা : ০১৭১৫-৪৭৪২৯৬ ☎ উপজেলা সমবায় অফিসার, পূর্বধলা : ০১৭১৭-০৪৩৬৩৯ ☎ সম্পাদক পূর্বকন্ঠ ☎ ০১৭১৩৫৭৩৫০২ ☎
মোঃ শফিকুল আলম শাহীন সম্পাদক ও প্রকাশক
পূর্বকণ্ঠ ২০১৬ সালে তথ্য অধিদপ্তরে নিবন্ধনের জন্য আবেদিত।
বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয়

স্টেশন রোড, পূর্বধলা, নেত্রকোনা।

হেল্প লাইনঃ +৮৮০৯৬৯৬৭৭৩৫০২

E-mail: info@purbakantho.com