সোমবার ১৮ই অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ২রা কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

নজরুলের প্রেমিকারা

ইমাম মেহেদী :  |  আপডেট ৯:৪৮ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ২৫ মে ২০২০ | প্রিন্ট  | 198

নজরুলের প্রেমিকারা

কবি নজরুলকে বহুমাত্রিকভাবে বিশ্লেষণ করার সুযোগ রয়েছে। তিনি যেমন আমাদের দ্রোহের কবি, ঠিক তেমনি প্রেমের কবি। অন্যদিকে নজরুল আমাদের যুদ্ধদিনের প্রেরণার কবি। মানব প্রেমে আকৃষ্ট হয়ে নজরুল যেমন লিখেছেন বিদ্রোহী কবিতা ঠিক তেমনি নারী প্রেমে আকৃষ্ট হয়ে নিজেকে সমর্পন করছেন করুণভাবে। জীবনের শেষ ভাষণে কবি বলেছেন: ‘আমি কবি হতে আসিনি, আমি নেতা হতে আসিনি, আমি প্রেম দিতে এসেছিলাম, প্রেম পেতে এসেছিলাম।’

নজরুলের জীবনে নার্গিস, প্রমীলা, ফজিলাতুুন্নেছাসহ অনেক নারী এসেছেন প্রেমের পরশ নিয়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে। সেই প্রেম তাঁকে শরবিদ্ধ করেছে বারবার নিদারুণভাবে। কবির জীবনে প্রথম নারী প্রেমের উৎপত্তি ঘটে ১৯২১ সালে কুমিল্লার মুরাদনগরের দৌলতপুর গ্রামের অগ্রজবন্ধুপ্রতিম আলী আকবর খানের বিধবা বোনের কন্যা সৈয়দা আসার খাতুনের সাথে। নজরুল ভালোবেসে তাঁর নাম দিলেন ‘নার্গিস’। প্রথম পরিচয়ের পর নার্গিসের পক্ষ থেকে তেমন সাড়া না মিললেও নজরুলের ‘এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণর্তুয’-এর ছন্দে প্রেমিকা হিসেবে ধরা দিলেন তিনি। যদিও বিয়ের প্রথম রাতেই ছিন্ন হয়ে যায় দু’জনের বন্ধন। কোনো এক অজ্ঞাত শর্তে  সবকিছুর আনুষ্ঠানিকতা থাকা সত্ত্বেও হঠাৎ নজরুল বেঁকে বসলেন। নজরুল গবেষক অনেকের মতে বিবাহকার্য শেষ হয়েছিলো, কারো মতে হয়নি। বিয়ের আসর থেকেই অভিমানি নজরুল উঠে গিয়েছিলেন। এরপর কবি নার্গিসের ভালোবাসা উপক্ষো করে চলে এসেছিলেন কুমিল্লায়।


নজরুলের জীবনে দ্বিতীয় বারের মতো নারীর আবির্ভাব ঘটে ১৯২২ সালের মার্চ মাসে। কলকাতার মোসলেম পাবলিকেশন্স হাউজ থেকে প্রকাশিত হয় প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘ব্যথার দান’। এই বইটির উৎসর্গপত্রে কবি লিখেছেন: ‘মানসী আমার/ মাথার কাঁটা নিয়েছিলুম বলে/ ক্ষমা করনি/ তাই বুকের কাঁটা দিয়ে/ প্রায়শ্চিত্ত করলুম।’

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কে এই মানসী? আসানসোলের দারোগার মেয়ে স্বর্ণলতা গঙ্গোপাধ্যায়। এই স্বর্ণলতা সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্য উপাত্তের সন্ধান মেলেনি পরবর্তীকালে।

প্রমীলার সঙ্গে নজরুলের প্রথম পরিচয় ঘটেছিল অবশ্য ১৯২১ সালের মার্চ মাসে। ১৯২৪ সালের ২৪ এপ্রিল কবি প্রমীলার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। নার্গিসের বাড়ি থেকে চলে এসে কবি উঠেছিলেন কান্দিপাড়ে একটি হিন্দু বাড়িতে। সেখানে এসে নতুন করে প্রেমে জড়ালেন দুলির সঙ্গে। এই দুলির পুরো নাম দোলনচাঁপা। দোলনচাঁপার ভালোবাসায় আড়াল হলো সদ্য নার্গিসের সাথে বিচ্ছেদের। দোলনচাঁপাকে নিয়ে কবি লিখলেন:

‘হে মোর রাণী! তোমার কাছে হার মানি আজ শেষে

আমার বিজয় কেতন লুটায় তোমার চরণ তলে এসে।’

কবি দোলনচাঁপাকে ভালোবেসে নাম দিলেন- প্রমীলা। এই অসম প্রেম সেনগুপ্ত পরিবার মানতে নারাজ। প্রমীলার মা বিধবা গিরিবালা সেনগুপ্ত পরিবার থেকে বের হয়ে মেয়েকে নিয়ে কলকাতায় গিয়ে বিয়ে দিলেন নজরুলের সঙ্গে। ১৯২৮ সালে দ্বিতীয়বার ‘মুসলিম সহিত্য সমাজ’ এর দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে কবি ঢাকায় এলে কবির সঙ্গে পরিচয় ঘটে নজরুলের জীবনের মহীয়সী নারী ফজিলাতুন্নেছার সঙ্গে কাজী মোতাহার হোসেনের মাধ্যমে। আর এই পরিচয় কবির জীবনকে পর্যায়ক্রমে ধাবিত করে করুণ জীবন ও কাব্যরসে। কবির আকুলতা ও ব্যকুলতার মাধ্যমে প্রেমের প্রকাশ ঘটলেও কঠিন হৃদয়ের নারী ফজিলাতুন্নেছার পক্ষ থেকে সাড়া মেলেনি কখনও। আবেগপ্রবণ কবি নজরুল ফজিলাতুন্নেছাকে নিয়ে একাধিক গান ও কবিতাও রচনা করেছেন। কাজী মোতাহার হোসেনের মাধ্যমে চিঠি লিখে খোঁজখবর জানার চেষ্টা করতেন তিনি।

নজরুল গবেষকদের গবেষণায় উঠে এসেছে কবি তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতার সংকলন ‘সঞ্চিতা’ উৎসর্গ করতে চেয়েছিলেন ফজিলাতুন্নেছাকে। কিন্তু তাতে তিনি রাজি হননি। ১৯২৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ড পাড়ি জমান ফজিলাতুন্নেছা। সেখানেই শামসুজ্জোহা নামের এক উচ্চশিক্ষিত যুবকের সঙ্গে পরিচয় ঘটে এবং পরবর্তীতে বিয়ে করেন তাকে।

১৩ বছর বয়সী সুন্দরী ও সুমিষ্ঠ কণ্ঠের অধিকারী ঢাকার বনগ্রামের মেয়ে রানু সোম এর খোঁজ পান কবি কলকাতার সংগীত শিল্পী দিলীপ রায়ের কাছ থেকে। পরে ১৯২৮ সালেই কাজী মোতাহার হোসেনের সহায়তায় কবি রানু সোমকে খুঁজে বের করেন এবং তার বাসায় উপস্থিত হন আশ্চর্যজনকভাবে। ওই রাতেই কবি রানুসোমের গানের গুরু বনে যান। এই যাত্রাকালে কবি নজরুর প্রায় মাস খানেক ঢাকায় থাকেন। প্রতিদিনই রানু সোমকে গান শেখাতে যেতেন।

ঐ একই বছর কবির জীবনে পুনরায় নারীর আবির্ভাব ঘটে; তিনি হলেন উমা মৈত্র। উমা মৈত্রের পিতা ছিলেন তৎকালীন ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ। তিনি কবিতা ও সংগীত প্রিয় ব্যক্তি ছিলেন। উমা মৈত্রের মাতা ছিলেন উচ্চশিক্ষিত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েট। তাঁদের একমাত্র মেয়ে নোটন ছিলেন সুদর্শনা ও সংগীতপ্রিয়। এই পরিবার সংগীত ও সাংস্কৃতিক পরিবার হওয়ার কারণে নজরুলের সঙ্গে সম্পর্ক গাঢ় হয়ে যায় দ্রুত।

গান শেখাতে শেখাতে কবি নজরুল এই অনন্যা সুন্দরীর প্রেমে আকৃষ্ট হয়েছিলেন কি? নজরুলের জীবনে যতবার নারীর কথা এসেছে, ততবার নার্গিস, প্রমীলা, ফজিলাতুন্নেছা ও নোটনের কথা এসেছে। যদিও কবি কখনও নোটন ও রানু সোমকে প্রেম নিবেদন করেননি। কবি মনের আঙ্গিনায় অজান্তেই কি এই দুজনের প্রতি ভালোবাসার বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল- সে প্রশ্ন থেকেই যায়! নোটনকে নিয়ে নজরুলের গান: ‘নাইবা পড়িলে নোটন খোঁপায় ঝুমকো জবার ফুল।’ গানটি অব্যক্ত অনেক কথা যেন বলে দেয়।

কবি নজরুলের জীবনের কোনো একসময় পরিচয় ঘটে জাহানারা ইমামের সঙ্গে। কবি জাহানারা ইমামের লাল কাপড়ে মোড়ানো খাতায় বিভিন্ন সময়ে ৭টি গান ও ৮টি কবিতা লিখে দিয়েছিলেন। এবং উৎসর্গ করেছিলেন মীরাকে। এই মীরা হলো জাহানারা ইমামের ডাক নাম। মিরাকে নিয়ে লেখা দুটি লাইন: ১. সুন্দর তুমি, নয়ন তোমার মানস নীলোৎপল। ২. সুন্দর তনু, সুন্দর মন হৃদয় পাষাণ কেন?

নজরুলের জীবনে গান হলো বিধাতা প্রদত্ত একক শিল্পী মানসের প্রতীক। এই গানই নজরুলকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পর্যায় নিয়ে গেছে। গান শেখাতে শেখাতে কবির জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছেন আরেক নারী কানন দেবী। সম্ভবত, ১৯৩০ সালে কানন দেবীর সঙ্গে নজরুলের পরিচয় ঘটে। কানন দেবী ও নজরুলকে নিয়ে তৎকালীন সময়ে শিল্পীমহল ও সমাজে নানা কুৎসা রটাতো নিন্দুকেরা। তখনকার সময়ে ‘শনিবারের চিঠি’-তে নজরুলকে নিয়ে এই কুৎসা প্রকাশ পেত।

প্রকৃত পক্ষে কবি নজরুল গান শিখিয়েছেন, কবিতা লিখে দিয়েছেন এবং উৎসর্গ করেছেন অনেক নারীকেই। ইন্দুবালা দেবী, আঙ্গুরবালা দেবী, বিজনবালা ঘোষ, সুপ্রভা সরকার, ফিরোজা বেগম ছিলেন নজরুলের শিষ্য। কিন্তু কানন দেবী, জাহানারা ইমাম, নোটন, রানু সোমকে নিয়ে কবি গান ও কবিতা লিখেছেন এবং উৎসর্গ করেছেন প্রেমিক পুরুষ হিসেবেই সে কথা বলা কিঞ্চিৎ সংশয় থাকলেও পুরোটা অযৌক্তিক হবে না। অপরদিকে নার্গিস, প্রমীলা ও ফাজিলাতুন্নেছাকে কবি সরাসরি প্রেম নিবেদন করেছেন।

নারীর প্রেমে ব্যাকুল হয়ে কবি নজরুল লিখেছিলেন অজস্র গান ও কবিতা। নজরুল ভুবনে কবির জীবদ্দশার এই গান, কবিতা, চিঠি, প্রেম, ভালোবাসা, আকুতি-মিনতি, বিরহ-বেদনা সবই যেন নারীর প্রেমের পূজারী হয়ে এক অসহায় প্রেমিকের করুণ আর্তনাদের ইতিহাস। যে ইতিহাসের পেছনে নজরুল ছুটেছেন আর লিখেছেন অজস্র প্রেমের কবিতা, গান একজন প্রেমিক পুরুষ হিসেবেই।

 

ঢাকা/তারা

 

শেয়ার করুন..

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement
এক ক্লিকে বিভাগের খবর

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০৩১  
ঘোষনা : আমাদের পূর্বকন্ঠ ওয়েবসাইটে প্রবেশ করার জন্য আপনাকে স্বাগতম। আপনার আশপাশে ঘটে যাওয়া খবরা খবর জানাতে আমাদের ফোন করুন-০১৭১৩৫৭৩৫০২ এই নাম্বারে ☎ গুরুত্বপূর্ণ নাম্বার সমূহ : ☎ জরুরী সেবা : ৯৯৯ ☎ নেত্রকোনা ফায়ার স্টেশন: ০১৭৮৯৭৪৪২১২☎ জেলা প্রশাসক ,নেত্রকোনা:০১৩১৮-২৫১৪০১ ☎ পুলিশ সুপার,নেত্রকোনা: ০১৩২০১০৪১০০☎ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, সদর সার্কেল : ০১৩২০১০৪১৪৫ ☎ ইউএনও,পূর্বধলা : ০১৭৯৩৭৬২১০৮☎ ওসি পূর্বধলা : ০১৩২০১০৪৩১৫ ☎ শ্যামগঞ্জ পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র : ০১৩২০১০৪৩৩৩ ☎ ওসি শ্যামগঞ্জ হাইওয়ে থানা : ০১৩২০১৮২৮২৬ ☎ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা, পূর্বধলা: ০১৭০০৭১৭২১২/০৯৫৩২৫৬১০৬ ☎ উপজেলা সমাজসেবা অফিসার, পূর্বধলা : ০১৭১৮৩৮৭৫৮৭/০১৭০৮৪১৫০২২ ☎ উপজেলা মৎস্য অফিসার, পূর্বধলা : ০১৫১৫-৬১৪৯২১ ☎ উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা, পূর্বধলা : ০১৯৯০-৭০৩০২০ ☎ উপজেলা প্রাণি সম্পদ অফিসার, পূর্বধলা : ০১৭১৮-৭২৮২৯৪ ☎ উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) পূর্বধলা :০১৭০৮-১৬১৪৫৭ ☎ উপজেলা আনসার ভিডিপি অফিসার, পূর্বধলা : ০১৯১৪-৯১৯৯৩৮ ☎ উপ-সহকারি প্রকৌশলী, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিস, পূর্বধলা : ০১৯১৬-৮২৬৬৬৮ ☎ উপজেলা যুব উন্নয়ন অফিসার, পূর্বধলা : ০১৭১১-৭৮৯৭৯৮ ☎ উপজেলা কৃষি অফিসার, পূর্বধলা : ০১৭১৬-৭৯৮৯৪৬ ☎ উপজেলা শিক্ষা অফিসার, পূর্বধলা : ০১৭১৫-৪৭৪২৯৬ ☎ উপজেলা সমবায় অফিসার, পূর্বধলা : ০১৭১৭-০৪৩৬৩৯ ☎ সম্পাদক পূর্বকন্ঠ ☎ ০১৭১৩৫৭৩৫০২ ☎
মোঃ শফিকুল আলম শাহীন সম্পাদক ও প্রকাশক
পূর্বকণ্ঠ ২০১৬ সালে তথ্য অধিদপ্তরে নিবন্ধনের জন্য আবেদিত।
বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয়

স্টেশন রোড, পূর্বধলা, নেত্রকোনা।

হেল্প লাইনঃ +৮৮০৯৬৯৬৭৭৩৫০২

E-mail: info@purbakantho.com